মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংকট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- সব দূষণ চোখে দেখা যায় না। অদৃশ্য এই কণাগুলো নীরবে পরিবেশ থেকে খাদ্যে, খাদ্য থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশের সয়াবিন তেল, দুধ এবং টুথপেস্ট নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তাই এখন আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, স্বাধীন গবেষণা এবং জনসচেতনতা।
প্লাস্টিক একসময় আধুনিক সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হতো। এর সাশ্রয়ী মূল্য, বহুমুখী ব্যবহার এবং দীর্ঘস্থায়িত্ব শিল্প, কৃষি, চিকিৎসা ও খাদ্যব্যবস্থায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু আজ সেই প্লাস্টিকই মানবসভ্যতার জন্য এক নীরব বিপদে পরিণত হয়েছে।
কারণ প্লাস্টিক প্রকৃতিতে সহজে পচে না; বরং সূর্যালোক, তাপ, ঘর্ষণ ও পরিবেশগত ক্ষয়ের ফলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে যায়। পাঁচ মিলিমিটারের কম আকারের এসব কণাই মাইক্রোপ্লাস্টিক নামে পরিচিত। অদৃশ্য এই কণা এখন শুধু নদী-সমুদ্র বা মাটিতে নয়, মানুষের খাদ্য, পানীয়, এমনকি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও পৌঁছে গেছে। ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক আজ আর শুধু পরিবেশ দূষণের বিষয় নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের এক নতুন বৈশ্বিক সংকট।
২০০৪ সালে যুক্তরাজ্যের প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড থম্পসন ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় প্রথম ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ ধারণাটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপর দুই দশকের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে প্লাস্টিকের এই ক্ষুদ্র কণাগুলো পৃথিবীর প্রায় সব পরিবেশেই ছড়িয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) মতে, বিশ্বে প্রতি বছর ৪০ কোটিরও বেশি টন প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ‘গ্লোবাল প্লাস্টিকস আউটলুক’ জানাচ্ছে, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বৈশ্বিক প্লাস্টিক উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, অথচ উৎপন্ন প্লাস্টিক বর্জ্যরে মাত্র ৯ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে। বাকি বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক পরিবেশে জমা হয়ে ধীরে ধীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপান্তরিত হচ্ছে। ইউএনইপি সতর্ক করেছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।
আজ মাইক্রোপ্লাস্টিক সমুদ্র, নদী, ভূগর্ভস্থ পানি, কৃষিজমি, বৃষ্টির পানি, আর্কটিকের বরফ এবং বায়ুমণ্ডলেও পাওয়া যাচ্ছে। বাতাসের মাধ্যমে এসব কণা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে এটি কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের নয়; বৈশ্বিক পরিবেশব্যবস্থার একটি সংকটে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই কণাগুলো এখন খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় মাছ, সামুদ্রিক খাদ্য, লবণ, চিনি, মধু, চাল, ফলমূল, শাকসবজি, বোতলজাত পানি, কলের পানি, দুধ, শিশুখাদ্য এবং ভোজ্য তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসই এখন অদৃশ্য প্লাস্টিকের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
একসময় ধারণা করা হতো, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরের বাইরে বেরিয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ‘এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল’, ‘দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’ এবং ‘নেচার মেডিসিন’-এ প্রকাশিত গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা, হৃদযন্ত্র, যকৃত, বৃক্ক এবং মস্তিষ্কে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিশেষ করে ‘নেচার মেডিসিন’-এ ২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণায় মানব মস্তিষ্কে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। তবে বিদ্যমান গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কণা শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়াতে পারে, অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টির ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্লাস্টিকে ব্যবহৃত বিসফেনল-এ (বিপিএ), ফ্যাথালেটসসহ বিভিন্ন রাসায়নিককে অন্তঃস্রাব বিঘ্নকারী পদার্থ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা প্রজনন স্বাস্থ্য ও শিশুদের বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। আবার মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশের ভারী ধাতু ও বিষাক্ত রাসায়নিকও বহন করতে পারে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ায়। বাংলাদেশেও এই সংকটের প্রমাণ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। দ্রুত নগরায়ণ, প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বাড়ছে। এর প্রভাব এখন খাদ্যেও দেখা যাচ্ছে।
২০২৬ সালে ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এ প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম গবেষণায় বাজারে বিক্রি হওয়া ব্র্যান্ডেড ও নন-ব্র্যান্ডেড সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। নন-ব্র্যান্ডেড তেলে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল এবং নমুনাগুলোতে নাইলন, পলিইউরেথেনসহ বিভিন্ন ধরনের পলিমার শনাক্ত হয়েছে।
সয়াবিন তেল বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারের দৈনন্দিন রান্নার অপরিহার্য উপাদান হওয়ায় এই গবেষণার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। যদিও গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, এই দূষণ ইচ্ছাকৃত নয়; বরং উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিক কণা প্রবেশ করতে পারে। একইভাবে ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস’-এ ২০২৪ সালে প্রকাশিত গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া গুঁড়া দুধ ও তরল দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। শিশু ও বয়স্কদের অন্যতম প্রধান খাদ্য হওয়ায় এই ফলাফল জনস্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
গবেষকদের মতে, উৎপাদনযন্ত্র, প্লাস্টিক মোড়ক, সংরক্ষণ ব্যবস্থা কিংবা বাতাসে ভাসমান সিনথেটিক তন্তু থেকে এই দূষণ ঘটতে পারে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আলোচিত গবেষণাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবেশবাদী সংগঠন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) জুলাই ২০২৬ সালের গবেষণা। এতে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া দেশীয় ও আমদানিকৃত ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ইএসডিওর গবেষণা অনুযায়ী, পরীক্ষিত নমুনার ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। টুথপেস্ট খাদ্য নয়, কিন্তু এটি প্রতিদিন মানুষের মুখগহ্বরে ব্যবহৃত হয় এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে এর একটি অংশ গিলে ফেলার সম্ভাবনা থাকে। ফলে এই গবেষণা প্রমাণ করে যে মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের পণ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিস্তার ঘটছে।
তবে, বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন কোনো প্রমাণ নেই যে খাদ্য বা ভোক্তাপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশিয়ে দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্লাস্টিকনির্ভর উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্যাকেজিং ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপ থেকেই এই দূষণ ঘটছে। তাই সমস্যাটির সমাধানও খুঁজতে হবে পুরো উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে।
এখানে রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ওইসিডির মতে, বিশ্বে প্লাস্টিক উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে, কারণ এটি শিল্পের জন্য অত্যন্ত সস্তা ও লাভজনক কাঁচামাল। প্লাস্টিক উৎপাদনকারী ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প বিপুল মুনাফা অর্জন করলেও পরিবেশ দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির ব্যয় বহন করে রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষ। অর্থনীতির ভাষায় এটিই ‘নেতিবাচক বহিঃপ্রভাব’, যেখানে মুনাফা ব্যক্তি খাতে কেন্দ্রীভূত হলেও ক্ষতির বোঝা বহন করে পুরো সমাজ।
বাংলাদেশে এখন খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড বা নিয়মিত জাতীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, পরিবেশ অধিদফতর এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে একটি জাতীয় গবেষণা ও নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। ভোজ্য তেল, দুধ, শিশুখাদ্য, বোতলজাত পানি, মাছ এবং অন্যান্য বহুল ব্যবহৃত খাদ্যপণ্যে নিয়মিত পরীক্ষা চালাতে হবে। একই সঙ্গে একবার ব্যবহারযোগ্য অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক কমানো, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং নিরাপদ বিকল্প উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোও সময়ের দাবি।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংকট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- সব দূষণ চোখে দেখা যায় না। অদৃশ্য এই কণাগুলো নীরবে পরিবেশ থেকে খাদ্যে, খাদ্য থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশের সয়াবিন তেল, দুধ এবং টুথপেস্ট নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তাই এখন আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, স্বাধীন গবেষণা এবং জনসচেতনতা। কারণ আজ যে অদৃশ্য প্লাস্টিকের কণা আমাদের খাদ্যে প্রবেশ করছে, তা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য এক বড় মূল্য দাবি করতে পারে।
লেখক : গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে