ভেজালের বাজারে নিরাপত্তার পরীক্ষা

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

মতামত

সম্প্রতি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ৪টি প্রতিষ্ঠানের ৮টি পণ্য দেশের বাজার

2026-08-01T05:44:00+00:00
2026-08-01T05:44:00+00:00
 
  শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
ভেজালের বাজারে নিরাপত্তার পরীক্ষা
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র
প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৪৪ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
সম্প্রতি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ৪টি প্রতিষ্ঠানের ৮টি পণ্য দেশের বাজার থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে। 

যেসব খাদ্যপণ্য ও প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো- ইষ্ট কেক ইন্টারন্যাশনাল ফুড লিমিটেডের ইষ্ট কেক পুর পিঠা জ্যাম ফিল্ড (ইনট্যাক্ট), ইস্ট জিবাই ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ইষ্ট বেকার স্লাইস ব্রেড শিল্ক জ্যাম ফিল্ড ( ইনট্যাক্ট) এবং আরবোটিং ফুড কোম্পানি লিমিটেডের আরবোটিং ফুড স্লাইস ব্রেড মিক্স জ্যাম ফিল্ড (ইনট্যাক্ট)। বিএসটিআই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রত্যাখ্যানপত্র পাঠিয়েছে এবং পরিবেশক, ডিলার, খুচরা বিক্রেতা এবং বাজার থেকে অবিলম্বে এসব পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ

দিয়েছে। কেননা বিএসটিআই এসব পণ্যে মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ, মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অণুজীবের উপস্থিতি এবং নির্ধারিত মানের চেয়ে কম মানের ভিটামিন পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ফ্রেশ গার্ডেন এগ্রো রিসোর্সেসের আমের আচারের একটি ব্যাচে বেশি প্রিজারভেটিভ পাওয়া গেছে। 

কাজী ফুড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বেলিসিমো ব্র্যান্ডের রোটোন্ডো হ্যাজেলনাট কোটেড চকোলেট আইসক্রিমে নন ফ্যাট দুগ্ধজাত কঠিন পদার্থ বাংলাদেশের মানের তুলনায় অতিরিক্ত পাওয়া গেছে। অলিভ বাংলাদেশ লিমিটেডের লাবণ্য ব্র্যান্ডের মিল্ক স্কিন লোশন, অ্যালোভেরা স্কিন লোশন, অলিভ ও লাবণ্য ব্র্যান্ডের ফোমিং মিল্ক, তুলসী ফেসওয়াশ ও লাবণ্য ব্র্যান্ডের অ্যালোভেরা শ্যাম্পুতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অণুজীবের উপস্থিতি পেয়েছে বিএসটিআই। 

নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ভেজাল খাদ্য বলতে এমন খাদ্য বা খাদ্যদ্রব্যের অংশ বোঝায় যাকে রঞ্জিত, স্বাদ-গন্ধযুক্ত, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ বা আকর্ষণীয় করার জন্য এরূপ পরিমাণ উপাদান দ্বারা মিশ্রিত করা হয়েছে, যার ফলে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষতি হয়েছে। 

অথবা খাদ্যকে রঞ্জিতকরণ, আবরণ প্রদান বা আকার পরিবর্তন করার জন্য এমন কোনো উপাদান মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে মিশানো হয়েছে, যার ফলে মূল খাদ্যদ্রব্যের ক্ষতি হয়েছে, গুণাগুণ ও পুষ্টিমান হ্রাস পেয়েছে। অথবা স্বাভাবিক উপাদানকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অপসারণ করে অপেক্ষাকৃত স্বল্প মূল্যের ভিন্ন উপাদান মিশিয়ে ওজন বা পরিমাণ বৃদ্ধি বা আকর্ষণীয় করে ক্রেতার আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতি করছে।

আইনের নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা সম্পর্কিত বিধিনিষেধ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা তার পক্ষে নিয়োজিত ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অথবা বিষক্রিয়া সৃষ্টিকারী রাসায়নিক দ্রব্য বা উভয় উপাদান বা বস্তু যেমন ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, সোডিয়াম সাইক্লামেট, কীটনাশক বা বালাইনাশক যেমন ডিডিটি, পিসিবি, তেল ইত্যাদি খাদ্যের রঞ্জক বা সুগন্ধি, আকর্ষণ সৃষ্টি করুক বা না করুক বা অন্য কোনো বিষাক্ত সংযোজনদ্রব্য বা প্রক্রিয়া সহায়ক কোনো খাদ্য বা খাদ্য উপকরণে ব্যবহার বা অন্তর্ভুক্তকরণ করতে পারবে না। 

এ ধরনের খাদ্য মজুদ বা বিক্রয় করতে পারবে না। কোনো ব্যক্তি মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তাসম্পন্ন বা বিকিরণযুক্ত পদার্থ বা ভারী ধাতু কোনো খাদ্যদ্রব্য বা উপকরণে ব্যবহার করতে পারবে না। আরও বলা আছে যে, কোনো ব্যক্তি বা তার পক্ষে নিয়োজিত অন্য কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ধারিত মান অপেক্ষা নিম্নমানের কোনো খাদ্য আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ বা বিক্রয় করতে পারবে না। 

ভেজাল মিশ্রিত করার উদ্দেশ্যে কোনো ভেজালকারী দ্রব্য খাদ্য স্থাপনায় রাখতে পারবে না। মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো খাদ্য আমদানি বা প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ বা বিক্রয় করতে পারবে না। প্যাকেটকৃত ও কোনো খাদ্যদ্রব্য মোড়কে লিপিবদ্ধ তথ্যাবলি পরিবর্তন করে বা মুছে কোনো খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করতে পারবে না। 

কোনো ব্যক্তি রোগাক্রান্ত বা মৃত পশুপাখির মাংস, দুধ বা ডিম দ্বারা কোনো খাদ্য বা খাদ্য উপকরণ প্রস্তুত, সংরক্ষণ বা বিক্রয় করতে পারবে না। কোনো ব্যক্তি ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হয়ে কোনো খাদ্য উপকরণ প্রস্তুত, পরিবেশন বা বিক্রয় করতে পারবেন না। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) নতুন বিধিমালা সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। এই বিধিমালা অনুযায়ী রাস্তার পাশের ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে আমদানিকারক ও বড় আকারের খাদ্য প্রক্রিয়াকারী প্রতষ্ঠিান, খাবারের ব্যবসার কাজে জড়িত সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স নিতে হবে। 

খাদ্যের মান উন্নত ও খাদ্য ব্যবসার ওপর নজরদারি বাড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই বিধিমারা অনুযায়ী পিঠা, পুরি ও পেঁয়াজির মতো খাবারের ব্যবসায়ীদেরও নিবন্ধন নিতে হবে। নিবন্ধনের ফি হবে ১ হাজার টাকা এবং নবায়নের খরচ হবে ৫০০ টাকা। 

 বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল একটা মহোৎসবের মতো। অসাধু ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার লোভে বিভিন্ন উপায়ে খাদ্যে ভেজাল মেশায়। তারা যেমন- মাছ, মাংস ও ফলের পচনরোধ ও অনেক দিন খাবার তাজা রাখতে ফরমালিন ব্যবহার করছে, তেমনি দুধে পানি মেশানো, মাখন তুলে নেওয়া, খাঁটি ঘিয়ের সঙ্গে পশুর চর্বি ও কৃত্রিম সুগন্ধি মেশাচ্ছে। 

অসাধু ব্যবসায়ীরা চাল, ডাল প্রভৃতি খাদ্যশস্যের ওজন বৃদ্ধিতে বালু, কাঁকর এমনকি শস্য দানাকৃতির প্লাস্টিক মেশাচ্ছে। ফল দ্রুত পাকাতে যেমন ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করছে, অন্যদিকে শাকসবজিতে ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার করছে। বিভিন্ন মসলা যেমন- হলুদ বা মরিচে কাঠের গুঁড়া, ইটের গুঁড়া এবং বিষাক্ত রাসায়নিক রং মেশাচ্ছে। 

এসব ভেজাল খাদ্য খেয়ে মানবদেহে নানা রকম রোগ হচ্ছে। খাদ্যে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিকদ্রব্য মানুষের যকৃত ও বৃক্ক নষ্ট করে দিচ্ছে। ফলমালিন, কার্বাইড ও কৃত্রিম রঙের কারণে ফুসফুস, পাকস্থলীতে ক্যানসার দেখা দিচ্ছে। গ্যাস্ট্রিক, আলসার, ডায়রিয়াসহ নানাবিধ রোগ হচ্ছে। শিশুরা বিকলাঙ্গ বা প্রতিবন্ধী হিসেবে জন্ম নিচ্ছে। 

এ অবস্থায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। ভেজাল খাদ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে বয়কট করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানাতে হবে। কেনাকাটায় সচেতন হতে হবে। 

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুযায়ী খাদ্যে ভেজাল মেশানো বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর দ্রব্য ব্যবহারের ফলে প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি থাকলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। 

এই সব আইন ও শাস্তি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। তা না হলে ভেজাল খাদ্যের এই মহোৎসব থেকে আমি আপনি কেউই রেহাই পাব না। 

লেখক : পরিবেশ বিষয়ক লেখক

মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   ভেজাল  বাজার  নিরাপত্তা  পরীক্ষা 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: