ভূমিকম্প : ঝুঁকির শহরে নিরাপত্তার পরীক্ষা

ড. কামরুজ্জামান

মতামত

ভূমিকম্পের সময় কী করণীয় সে বিষয়ে জনগণকে ব্যাপকভাবে সচেতন করা জরুরি। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি দক্ষ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তোলা, নিয়মিত

2026-08-03T06:17:19+00:00
2026-08-03T06:17:19+00:00
 
  সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬,
১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
মতামত
ভূমিকম্প : ঝুঁকির শহরে নিরাপত্তার পরীক্ষা
ড. কামরুজ্জামান
প্রকাশ: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ৬:১৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ভূমিকম্পের সময় কী করণীয় সে বিষয়ে জনগণকে ব্যাপকভাবে সচেতন করা জরুরি। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি দক্ষ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তোলা, নিয়মিত প্রশিক্ষণের আয়োজন এবং আধুনিক উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ভূমিকম্প মোকাবিলায় এখনই কার্যকর প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যথায় বড় ধরনের দুর্যোগে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ ও এর আশপাশের অঞ্চলে মোট ৩২টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ১২টি। জুনে ৬টি, মে মাসে ৪টি এবং জানুয়ারি ও মার্চে ২টি করে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। তীব্রতার ভিত্তিতে বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩২টি ভূমিকম্পের মধ্যে ১৩টি ছিল মৃদু, ৯টি ক্ষুদ্র, ৮টি মাঝারি, একটি খুবই মৃদু এবং একটি তীব্র মাত্রার।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এসব ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল রাজধানী ঢাকা থেকে বিভিন্ন দূরত্বে ছিল। গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে প্রায় ৩ হাজার ৩৪১ কিলোমিটার দূরে ৭ দশমিক ১ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যা চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প। জুন মাসেও কয়েকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ৭ জুন ঢাকা থেকে ৪৩২ কিলোমিটার দূরে ৫ দশমিক ৫ মাত্রার, ৯ জুন ২৮০ কিলোমিটার দূরে ৩ দশমিক ১ মাত্রার, ১১ জুন ২৯০ কিলোমিটার দূরে ৪ দশমিক ৫ মাত্রার, ১৮ জুন ৩৬১ কিলোমিটার দূরে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার এবং ২২ জুন ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে ৪ দশমিক শূন্য মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। সবশেষ ২৮  জুন রাতে ঢাকা থেকে ৩৩৪ কিলোমিটার দূরে ৪ দশমিক এক মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

ভূতাত্ত্বিক তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের আশপাশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূগর্ভস্থ শক্তি সঞ্চিত রয়েছে, যা যেকোনো সময় নিঃসৃত হতে পারে। ছোট ছোট ভূকম্পনকে অনেকেই সেই সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করেন। ফেব্রুয়ারিতে ১২ বার এবং জুনে ৬ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সবশেষ ১২ জুলাই ভোর ৫টা ৫ মিনিটে বঙ্গোপসাগরে ৪ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল কাকিনাডা উপকূল থেকে ২২৫ কিলোমিটার দূরে, ১০ কিলোমিটার গভীরে। এর মৃদু প্রভাব ভারতের বিশাখাপত্তনমসহ অন্ধ্রপ্রদেশের কয়েকটি জেলায় অনুভূত হয়।

ভূমিকম্প প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক ঘটনা। বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। তাই ভূমিকম্প নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে বাংলাদেশ যে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। জাপানে বছরে প্রায় ৫০০টি ভূমিকম্প হয়। পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলোর চলাচলের ফলেই মূলত ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ এবং এর উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ভারতীয়, বার্মা ও ইউরেশীয় প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত। ধারণা করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের ভূগর্ভে বিপুল চাপ ও শক্তি সঞ্চিত হয়ে আছে, যা যেকোনো সময় বড় মাত্রার ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে। অনেকের মতে, বড় ভূমিকম্পের আগে ছোট ছোট ভূমিকম্প অনুভূত হওয়াও সেই সম্ভাবনার একটি লক্ষণ।

বাংলাদেশে মাঝারি বা বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতি অপূরণীয় হতে পারে। কারণ দেশের বহু স্থাপনা অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছে। ঢাকা ছাড়াও বিভাগীয় শহরগুলোর অনেক ভবন পরিকল্পনাহীন এবং বহু ভবনের আয়ুষ্কালও শেষ হয়ে গেছে। ফলে সেগুলো ধ্বংসের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ। শুধু ঢাকাতেই প্রায় তিন কোটি মানুষের বসবাস। বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে বহুতল ভবন ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

এই বাস্তবতায় ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রস্তুতি গ্রহণই সবচেয়ে জরুরি। ভূমিকম্পের আগে, চলাকালে এবং পরে কী করণীয় সে বিষয়ে ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট প্রস্তুতি থাকতে হবে।

ভূমিকম্প অনুভূত হলে বহুতল ভবন থেকে আতঙ্কে লাফ দেওয়া যাবে না। সম্ভব হলে মাথা বালিশ বা অন্য কোনো শক্ত বস্তু দিয়ে সুরক্ষিত রাখতে হবে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ করে সেগুলো থেকে দূরে অবস্থান নিতে হবে। ভবন থেকে নামার প্রয়োজন হলে লিফট ব্যবহার করা যাবে না। ধৈর্য ধরে সিঁড়ি ব্যবহার করে খোলা জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কোনোভাবেই হুড়াহুড়ি করা উচিত নয়। টিনশেড, আধাপাকা বা দুর্বল নির্মাণের ঘরে অবস্থান করলে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ খোলা স্থানে চলে যেতে হবে। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে চার্জার লাইট, বোতলজাত পানি এবং শুকনো খাবার সংরক্ষণ করে রাখা উচিত।

ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিরও বিকল্প নেই। ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ ভবন চিহ্নিত করে প্রয়োজন হলে ভেঙে ফেলতে হবে। এটি ভবনমালিক বা সরকার উভয় পক্ষের উদ্যোগেই হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের
 
জন্য উপযুক্ত আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা। নতুন ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে। শহরের আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের সামনে এবং পাশে পর্যাপ্ত প্রশস্ত রাস্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 
একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামসমৃদ্ধ বিশেষ উদ্ধারকারী দল গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

ভূমিকম্পের সময় কী করণীয় সে বিষয়ে জনগণকে ব্যাপকভাবে সচেতন করা জরুরি। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি দক্ষ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তোলা, নিয়মিত প্রশিক্ষণের আয়োজন এবং আধুনিক উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ভূমিকম্প মোকাবিলায় এখনই কার্যকর প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যথায় বড় ধরনের দুর্যোগে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর 
মতামত লেখকের নিজস্ব


  বিষয়:   ভূমিকম্প  ঝুঁকির শহর  নিরাপত্তার পরীক্ষা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: