প্রতিটি পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাব থাকে। যাদের হিসাব যেমন আয় করে তেমনি কোন কোন খাতে কত টাকা ব্যয় করবে তারও একটি পরিকল্পনা থাকে। তেমনি একটি দেশের বছরজুড়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব বলতে যা বলা হয় সরকারের বাজেট। আর এই বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সরকারের দর্শন। কারণ এই বাজেটের সঙ্গে যুক্ত সারা দেশের আপামর মানুষ।
সেখানে একদিকে যেমন দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে উন্নত জীবনযাত্রা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। অন্যদিকে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার আত্মপ্রত্যয়। এই প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ‘সবার বাজেট’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। এটি শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং একটি দেশের সব মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি।
বাজেটের মূল দর্শন হলো অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করা, যাতে প্রত্যেক মানুষ তার প্রয়োজন, সম্ভাবনা ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন পায়। অর্থমন্ত্রী বাজেটোত্তর এক সংবাদ সম্মেলনে আগামী দিনের দেশের মানুষের আশা-প্রত্যাশা, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কথা বাস্তবায়নে দেশের সব শ্রেণির আন্তরিক অংশগ্রহণের মধ্যে এই বাজেট সফলতার দিকে এগিয়ে যাবে বলে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে একটা পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, যেখানে কিছু গোষ্ঠী সুবিধা পেয়ে গেছে, কিন্তু বিপুলসংখ্যক জনগণ এখনও মূলধারার বাইরে থেকে গেছে। এই বাজেটে সেই বৈষম্য কমিয়ে এনে সমাজের সব স্তরকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অংশ করে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্নীতি কমানোর আশা প্রকাশ করেন তিনি, কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দুর্নীতির প্রবণতা সৃষ্টি হয়। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি ও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে র্যাব-পুলিশের অভিযান বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। সঠিক নীতি, বাজারের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসার ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাজারে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতে হলে পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোতে সংস্কার আনতে হবে। এর জন্য প্রশাসনিক জটিলতা কমানো ও বাজার সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
একদিকে যেমন অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বিভিন্ন কর্মসংস্থান পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের মাধ্যমে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পের মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষদের জীবনমান উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি সংস্কৃতি ও সৃজনশীল খাতকে অর্থনীতির মূলধারায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে নতুন কর্মসংস্থান ও পর্যটনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের সংস্কৃতি, বিনোদন ও পর্যটন খাতে বিশাল বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পূর্বাচলে ১৬০ একর জায়গায় একটি বিশ্বমানের ক্রিয়েটিভ সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা শুধু বিনোদন নয়, বরং অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই কেন্দ্রের মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থান ও পর্যটন বিকাশে সহায়তা পাওয়া যাবে।
বাজেট বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও তা কাটিয়ে ওঠার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন ও অনলাইনে অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সংকট ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের কারণে অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে চার থেকে পাঁচ বছর, বলে ধারণা প্রকাশ করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী এই বাজেটকে গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী বলে উল্লেখ করেন। এটি দেশের সব মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এক নতুন দিগন্তের সূচনা। এই বাজেটের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও সামগ্রিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে- এটাই প্রত্যাশা।
সময়ের আলো/জেডি