বিশ্বকাপ ফুটবল এবং দেশের অর্থনীতি

আশিক বিন আলম সোহাগ

মতামত

ফুটবল কেবল মাঠের একটি খেলা নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রতি চার বছর পরপর যখন ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত

2026-06-11T05:25:37+00:00
2026-06-11T05:25:37+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬,
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
মতামত
বিশ্বকাপ ফুটবল এবং দেশের অর্থনীতি
আশিক বিন আলম সোহাগ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৫:২৫ এএম   (ভিজিট : ৮)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ফুটবল কেবল মাঠের একটি খেলা নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রতি চার বছর পরপর যখন ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়, তখন তার উন্মাদনা এবং তরঙ্গের ছোঁয়া লাগে বাংলাদেশেও। ভৌগোলিক দূরত্ব বা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আমাদের অবস্থান যা-ই হোক না কেন, ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে একটি বিশাল এবং সুনির্দিষ্ট প্রভাব ফেলে। আমাদের আবেগ, সংস্কৃতি এবং জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এই টুর্নামেন্টটি প্রতিবারই দেশের অর্থনীতিতে এক সাময়িক কিন্তু শক্তিশালী জোয়ার সৃষ্টি করে।

বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বকাপ ফুটবল আমাদের অর্থনীতিতে একই সঙ্গে বিপুল ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি করার পাশাপাশি বহু খাতে বিশাল ব্যবসার নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। বিশ্বকাপ ফুটবল আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি দৃশ্যমান হয়, তা হলো ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারে উপচেপড়া ভিড়। খেলা দেখার অভিজ্ঞতাকে আরও আকর্ষণীয় করতে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ নতুন টেলিভিশন, বিশেষ করে বড়পর্দার এলইডি বা স্মার্ট টিভি কেনার প্রতিযোগিতায় নামে। দেশের বড় বড় ইলেকট্রনিক্স ব্র্যান্ডগুলো এই সময়কে কেন্দ্র করে বিশেষ ছাড়, ক্যাশব্যাক ও কিস্তি সুবিধা ঘোষণা করে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে শত শত কোটি টাকার টেলিভিশন বিক্রি হয়। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পায় ইন্টারনেট সংযোগ, ক্যাবল টিভি বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সাবস্ক্রিপশন। খেলা দেখার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের চাহিদা বাড়ায় টেলিকম কোম্পানি এবং স্থানীয় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বহুগুণ বেড়ে যায়।

এ ধরনের প্রযুক্তিগত ও ইলেকট্রনিক্স খাতের চাঙ্গা ভাব সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বড় অঙ্কের অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করে। আমাদের দেশের তরুণ ও সাধারণ মানুষের ফুটবল আবেগের একটি বড় অংশজুড়ে থাকে প্রিয় দলের জার্সি কেনা। বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক মাস আগে থেকেই শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মার্কেটগুলো বিভিন্ন দলের জার্সিতে ছেয়ে যায়। এই বিশাল চাহিদাকে কেন্দ্র করে দেশের পোশাক খাত এবং স্থানীয় টেইলার্স বা ক্ষুদ্র বস্ত্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক বিপুল কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। শুধু জার্সিই নয়, বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ পতাকা তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমে এক বিশাল মৌসুমি ব্যবসার সৃষ্টি হয়। এই খাতটি অনানুষ্ঠানিক হলেও এই সমাজের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের হাজার হাজার মানুষের জন্য একটি দারুণ আয়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পতাকা ও জার্সি বিক্রেতাদের এই ব্যস্ততা প্রমাণ করে যে, বিশ্বকাপ কীভাবে তৃণমূল অর্থনীতির চাকা সচল রাখে।

ফুটবল ম্যাচ গভীর রাতের সময়সূচির কারণে আমাদের খাদ্য ও পানীয় খাতে অভূতপূর্ব জোয়ার আসে। মাঝরাতে প্রিয় দলের খেলা দেখার সময় চা, কফি, চিপস, কোল্ড ড্রিংকস এবং ফাস্ট ফুডের চাহিদা ব্যাপক আকার ধারণ করে। দেশের বড় বড় রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেগুলো বড়পর্দায় খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করে বিশেষ প্যাকেজ অফার করে। এর ফলে রেস্তোরাঁ ব্যবসা এবং অনলাইন ফুড ডেলিভারি অ্যাপগুলোর (যেমন ফুডপান্ডা, পাঠাও ফুড) ব্যবসা রাতারাতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। 

গভীর রাতেও রাইডারদের ব্যস্ততা এবং রেস্তোরাঁগুলোর অতিরিক্ত কেনাবেচা দেশের সেবা খাতকে ব্যাপকভাবে চাঙ্গা করে তোলে, যা সাধারণ সময়ে কল্পনাও করা যায় না। তবে বিশ্বকাপের এই অর্থনৈতিক প্রভাব কেবল ইতিবাচক খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর কিছু নেতিবাচক বা চ্যালেঞ্জিং দিকও রয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো সাধারণত আমাদের স্থানীয় সময় অনুযায়ী গভীর রাতে বা ভোরে অনুষ্ঠিত হয়। টানা গভীর রাত জেগে খেলা দেখার কারণে দেশের একটি বিশাল কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরদিনের কর্মদক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতার ওপর। 

সরকারি-বেসরকারি অফিস, কলকারখানা এবং বিশেষ করে পোশাক খাতের মতো উৎপাদনমুখী শিল্পে কর্মীদের ক্লান্তি ও অনুপস্থিতি উৎপাদনশীলতা কিছুটা হলেও হ্রাস করে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য সাময়িক ক্ষতি। তা ছাড়া বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া তীব্র আবেগ অনেক সময় দেশের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রিয় দলের হার-জিত নিয়ে সামাজিক দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ এবং জুয়া বা বাজির মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে অনলাইন বেটিং বা জুয়ার অ্যাপগুলোর ব্যবহার এই সময়ে মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধ উপায়ে বা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যায়, যা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এ ধরনের ডিজিটাল অর্থ পাচার একটি বড় ধরনের হুমকি। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমদানির ওপর চাপ। বিশ্বকাপের সময় যে কোটি কোটি টাকার টেলিভিশন কিংবা জার্সির কাঁচামাল বিক্রি হয়, তার একটি বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিশ্বজুড়ে যখন ডলার সংকট বা মূল্যস্ফীতির চাপ থাকে, তখন বিশ্বকাপের মতো একটি বিনোদনমূলক ইভেন্টের কারণে বিলাসবহুল বা অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি পেলে তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বাড়তি টানাপোড়েন তৈরি করে।

তাই এ ধরনের উৎসবের অর্থনৈতিক লাভ ও ক্ষতির হিসাবটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং ভারসাম্যপূর্ণ। বিশ্বকাপ ফুটবল মূলত আমাদের অর্থনীতিতে একটি ‘দ্বিমুখী তলোয়ার’-এর মতো। এটি যেমন একদিকে দেশের অভ্যন্তরে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি করে, অভ্যন্তরীণ অর্থের প্রবাহ বাড়ায় এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয়ের পথ সুগম করে; ঠিক তেমনিভাবে এটি উৎপাদনশীলতা হ্রাস, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং অবৈধ অর্থ পাচারের মতো ঝুঁকিও তৈরি করে। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের উচিত এই ফুটবল উন্মাদনার ইতিবাচক দিকগুলোকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো এবং এর নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবগুলোকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। 

ফুটবলের এই বৈশ্বিক উৎসবকে যদি আমরা সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সচেতনতার মাধ্যমে পরিচালনা করতে পারি, তবে এটি কেবল আমাদের বিনোদনের খোরাকই জোগাবে না, বরং আমাদের অর্থনীতিকেও একটি সাময়িক কিন্তু শক্তিশালী গতিশীলতা প্রদান করবে।

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ



  বিষয়:   বিশ্বকাপ  ফুটবল  দেশ  অর্থনীতি 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: