নারী ধর্ষণের সহায়ক যখন নারী

আমানুর রহমান

মতামত

​সমাজে নারীকে আমরা মমতাময়ী মা, স্নেহের বোন কিংবা নির্ভরতার অটুট প্রতীক হিসেবেই দেখে অভ্যস্ত। নারী মানেই যেন এক নিরাপদ আশ্রয়,

2026-06-08T14:30:15+00:00
2026-06-08T14:30:33+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
মতামত
নারী ধর্ষণের সহায়ক যখন নারী
আমানুর রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ২:৩০ পিএম  আপডেট: ০৮.০৬.২০২৬ ২:৩০ পিএম  (ভিজিট : ১৩)
সংগৃহীত ছবি
​সমাজে নারীকে আমরা মমতাময়ী মা, স্নেহের বোন কিংবা নির্ভরতার অটুট প্রতীক হিসেবেই দেখে অভ্যস্ত। নারী মানেই যেন এক নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে নিষ্ঠুরতার কোনো স্থান নেই। কিন্তু এই চিরচেনা ধারণার বাইরেও আমাদের চারপাশের সমাজে এক ভয়ংকর ও অন্ধকার রূপ রয়েছে, যা মাঝেমধ্যেই আমাদের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ভাবতেও শিউরে উঠতে হয়, যখন কোনো নারীর ওপর হওয়া পাশবিক নির্যাতন বা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে অন্য একজন নারী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করেন। একজন নারী হয়ে অন্য একজন নারীর সম্ভ্রমহানি বা চরম বিপদের মুহূর্তে রক্ষক না হয়ে ভক্ষকের দোসর হওয়ার এই প্রবণতা কেবল অমানবিকই নয়; বরং এটি আমাদের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয়ের এক চূড়ান্ত উদাহরণ।

পরিবারের ভেতরেই এমন অমানবিকতার চরম দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মর্মান্তিক ঘটনায়। পুলিশের দেওয়া তথ্য ও চার্জশিট থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসাকে ধর্ষণের মূল পরিকল্পনায় এবং অপরাধ সংঘটনে ধর্ষক সোহেল রানাকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করেছিল তারই স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। ঘটনার দিন সকালে শিশুটিকে কৌশলে নিজেদের ফ্ল্যাটে ডেকে নেয় সে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, স্বামী সোহেল রানা ইয়াবা সেবন করে শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণ করে এবং পরে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পুরোটা সময় স্বপ্না একই কক্ষে উপস্থিত ছিল। রামিসার মা যখন মেয়েকে খুঁজতে এসে দরজায় কড়া নাড়ছিলেন, স্বপ্না তখন দরজা তো খোলেইনি, উল্টো স্বামীকে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। একজন নারী হয়েও শিশুর প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা প্রমাণ করে, অন্ধ আনুগত্য ও বিকৃত মানসিকতার কাছে মানবিকতা ও অপরাধবোধ কীভাবে পুরোপুরি মুছে যেতে পারে।

​অপরাধীকে বাঁচাতে বা নিজের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান ধরে রাখতে নারীদের এই ভয়ংকর রূপ আমরা আরও অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি। ২০১৭ সালে বগুড়ার তুফান সরকার কাণ্ড সারা দেশে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছিল। এক কলেজশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে ধর্ষকের স্ত্রী আশা এবং তার বড় বোন, তৎকালীন নারী ওয়ার্ড কাউন্সিলর মারজিয়া হাসান রুমকি চরম অমানবিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। ধর্ষকের অপরাধ ঢাকতে এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে চুপ করানোর উদ্দেশ্যে এই দুই নারী ওই শিক্ষার্থী ও তার মাকে তুলে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালান এবং তাদের মাথা ন্যাড়া করে দেন। একই মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায় প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও, যেখানে প্রতিষ্ঠানের কথিত সুনাম রক্ষার মিথ্যা অজুহাতে অপরাধীকে আড়াল করা হয়।
আরও পড়ুন

২০১১ সালে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক পরিমল জয়ধরের হাতে ছাত্রী ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য ঘটনায় তৎকালীন অধ্যক্ষ হোসনে আরা বেগমের বিরুদ্ধেও প্রথম দিকে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছিল। এ ধরনের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ক্ষমতা ও পদের অহংকারের কাছে অনেক সময় নারীর নিজস্ব বিবেক ও মাতৃত্ববোধও নির্মমভাবে পরাজিত হয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সমবয়সিদের কাছ থেকে যেখানে একজন নারীর সবচেয়ে বেশি সমর্থন ও সহানুভূতি পাওয়ার কথা, সেখানেও নারীর প্রতি নারীর চরম বিশ্বাসঘাতকতার নজির রয়েছে। ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করায় তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দুই নারী সহপাঠী কামরুন নাহার মনি ও পপি সরাসরি সহায়তা করেছিল।

অন্যদিকে মুকসুদপুরে এক মাদরাসাছাত্রীকে ধর্ষণের ভিডিও ধারণ ও ধর্ষককে সহায়তা করার অভিযোগে মাদরাসার আরেক নারী শিক্ষক খাদিজা বেগমকে গ্রেফতার করা হয়। এই ভয়ংকর মানসিক আঘাত ও অপমান সইতে না পেরে ভুক্তভোগী ছাত্রীটি পরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। একজন শিক্ষিকা, যিনি ছাত্রীদের কাছে মায়ের সমতুল্য ও পরম নির্ভরতার জায়গা, তিনি যখন এমন জঘন্য অপরাধের সহযোগী বা নীরব দর্শক হন, তখন সমাজে আস্থার আর কোনো জায়গাই যেন অবশিষ্ট থাকে না।

ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় ছাড়িয়ে এই নৈতিক অবক্ষয় এখন সংঘবদ্ধ অপরাধ জগতেও গভীরভাবে শিকড় গেড়েছে। যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার ঘটনা এর একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। তিনি চাকরি বা ভালো উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে অসহায় তরুণীদের ডেকে আনতেন এবং প্রভাবশালীদের দিয়ে তাদের ওপর জোরপূর্বক যৌন নিপীড়ন ও শোষণে সরাসরি সহায়তা করতেন। একইভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই ধরা পড়া সংঘবদ্ধ নারী পাচারকারী চক্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এদের নেতৃত্বে অনেক সময় নারীরাই থাকেন, যাদের চক্রের ভেতরে ‘ম্যাডাম’ বা ‘খালা’ বলে সম্বোধন করা হয়।

অপরাধ বা অপরাধী মানসিকতার কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গ নেই। একজন নারী যখন ধর্ষক বা নিপীড়কের সহযোগী হন, তখন তার পেছনে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি অন্ধ আনুগত্য, ব্যক্তিগত লোভ কিংবা অপরাধীর ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণের মতো জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ লুকিয়ে থাকে। তবে কারণ যা-ই হোক না কেন, নারী হয়ে নারীর প্রতি এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়। আইন ও বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি আমাদের সমাজকেও এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। 

পরিবারের ভেতরে নৈতিক শিক্ষার ভিত মজবুত করার পাশাপাশি অপরাধের সহযোগী নারীদের বিরুদ্ধেও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। নারীত্বের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে প্রতিরোধ ও সহমর্মিতায়, অপরাধীর দোসর হওয়ার মাঝে নয়। যেদিন সমাজের প্রতিটি নারী এই সত্য অনুধাবন করতে পারবেন, কেবল সেদিনই এমন পৈশাচিকতার অবসান ঘটানো সম্ভব হবে।

লেখক, সমাজকর্মী

এএডি/


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: