বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ড আন্তর্জাতিক রিজার্ভ ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় অংশ ডলারভিত্তিক সম্পদে সংরক্ষণ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্রে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন ক্রমবর্ধমান হারে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছে এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বর্ণ মার্কিন ট্রেজারির বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব অর্জন করছে।
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের শেষে বৈশ্বিক রিজার্ভ সম্পদের মধ্যে স্বর্ণের অংশ বেড়ে ২৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এক বছর আগে এই হার ছিল ২০ শতাংশ। একই সময়ে মার্কিন ট্রেজারির অংশ ২৫ শতাংশ থেকে কমে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। সংখ্যার পার্থক্য খুব বড় না হলেও এর অর্থনৈতিক তাৎপর্য যথেষ্ট। কারণ রিজার্ভ সম্পদের এই পুনর্বিন্যাস আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি বিভিন্ন দেশের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দ্বিতীয়ত ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেক দেশকে তাদের রিজার্ভ আরও বৈচিত্র্যময় করতে উৎসাহিত করছে। তৃতীয়ত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার কারণে কয়েকটি দেশ ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর উপায় খুঁজছে। এসব কারণ মিলিয়ে স্বর্ণ আবারও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থার ইতিহাসে স্বর্ণের ভূমিকা নতুন নয়। ব্রেটন উডস ব্যবস্থার সময় বিশ্ব অর্থনীতির ভিত্তি ছিল স্বর্ণ ও ডলারের সমন্বিত কাঠামো। পরবর্তী সময়ে সেই ব্যবস্থা পরিবর্তিত হলেও স্বর্ণ কখনো সম্পূর্ণ গুরুত্ব হারায়নি। বরং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগকারী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক উভয়ের কাছেই এটি নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারাকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
আরও পড়ুন
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের রিজার্ভ কৌশলে পরিবর্তন আনছে। চীন, ভারত, পোল্যান্ড এবং তুরস্ক গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণ সংগ্রহ করেছে। এসব দেশের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, বহুমুখী রিজার্ভ কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় আরও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও তৈরি করে।
তুরস্কের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশটি দ্রুত স্বর্ণমজুদ বৃদ্ধি করেছিল। পরে আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে সেই মজুদের একটি অংশ ব্যবহার করতে হয়েছে। এই ঘটনা দেখায় যে স্বর্ণ শুধু দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় নয়, প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক তারল্যের উৎস হিসেবেও কাজ করতে পারে। ফলে অনেক দেশের কাছে এটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ইউরোর ভূমিকাও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে। ইউরোভিত্তিক আন্তর্জাতিক ঋণ বৃদ্ধি এবং ইউরোপীয় অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ প্রমাণ করে যে বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে আরও বহুমাত্রিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। এর অর্থ হলো, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক রিজার্ভ ব্যবস্থায় একক কোনো মুদ্রার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কমে আসতে পারে এবং বিভিন্ন সম্পদের মধ্যে ভারসাম্য বাড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে স্বর্ণের সম্পর্ক। একসময় যেসব প্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক উদ্যোগ নিজেদের প্রচলিত ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছিল, তাদের মধ্যেও এখন স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন যতই ঘটুক, মূল্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্বর্ণের গ্রহণযোগ্যতা এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য কেবল রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনও প্রধানত ডলারভিত্তিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নের বড় অংশই ডলারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে বৈশ্বিক ডলার বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়ে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই বাস্তবতা একাধিকবার দেখা গেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এবং মার্কিন সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়। এর ফলে অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশও বৈদেশিক মুদ্রার চাপে পড়ে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়, রিজার্ভ কমতে থাকে এবং মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। এসব ঘটনা দেখিয়েছে যে একক কোনো মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। স্বর্ণকে ডলারের বিকল্প হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে এটি ডলারের প্রতিস্থাপন নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম এখনও ডলার। বৈশ্বিক পণ্যবাজার, জ্বালানি লেনদেন এবং আর্থিক নিষ্পত্তির অধিকাংশই ডলারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ডলার রিজার্ভের গুরুত্ব অদূর ভবিষ্যতে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। প্রশ্নটি তাই ডলার বনাম স্বর্ণের নয়; বরং সঠিক ভারসাম্য নির্ধারণের।
রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন নয়, বরং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিশ্চিত করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে স্বর্ণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এটি কোনো দেশের দায় নয়, কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিশ্রুতিনির্ভর সম্পদ নয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সহজে অকার্যকরও করা যায় না। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আর্থিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা বৈশ্বিক বাজারে আস্থার সংকট দেখা দিলে স্বর্ণ অনেক সময় নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করে। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কি বৈশ্বিক পরিবর্তনগুলোর প্রতিক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, নাকি পরিবর্তনের আগেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিচ্ছি? অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব দেশ আগেভাগে ঝুঁকি শনাক্ত করে এবং রিজার্ভ কাঠামোতে বৈচিত্র্য আনে, তারা বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল থাকে। অন্যদিকে যারা পুরোনো বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে থাকে, তাদের জন্য সংকটের খরচ সাধারণত বেশি হয়।
বাংলাদেশের জন্য তাই মূল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত রিজার্ভের আকার নয়, রিজার্ভের গুণগত মান এবং কাঠামো। ডলার, ইউরো, স্বর্ণ এবং অন্যান্য নিরাপদ সম্পদের মধ্যে কী ধরনের ভারসাম্য দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থা যখন ধীরে ধীরে বহুমাত্রিক রূপ নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশেরও সেই পরিবর্তনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনীয় কৌশলগত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কারণ রিজার্ভ কেবল অর্থের সঞ্চয় নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত স্বাধীনতা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি।
স্বর্ণের প্রতি বাড়তে থাকা আগ্রহ এবং ডলারের আপেক্ষিক প্রভাব হ্রাসের আলোচনা মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন। এই পরিবর্তন কত দ্রুত এবং কত দূর পর্যন্ত যাবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে এটুকু স্পষ্ট যে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত প্রস্তুতির গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। বাংলাদেশের জন্যও এই বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
এএডি/