‘কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে হতে পারেন কীর্তিমান’ এই শিরোনামে ২ জুন ২০২৩ সালে দৈনিক দিনকাল ও অনলাইন পত্রিকা সারাবাংলায় প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি সত্যি সত্যি এতটা কীর্তিমান মানুষ হবেন তা কতজনের অনুমান ছিল। যাক, আমরা আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নিতে যাচ্ছেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি সবার মাঝে কীর্তিমান হয়ে থাকবেন চিরদিন।
সত্তরোর্ধ্ব বয়সে কঠিন একসময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন তিনি। যে সময়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও গণতন্ত্রের মাতা, দেশনেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে একটি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে রেখে বিনা ভোটের সরকার জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দেশনেত্রী কারাগারে, দলের পরবর্তী কান্ডারি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের শক্তির প্রতীক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সুদূর লন্ডনে। বিএনপি মহাসচিব নির্বাচনকে সামনে রেখে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা নিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠেন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য তৈরি করতে।
এখানে বলে রাখা দরকার, ২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভায় দেশনেত্রী তার বক্তৃতায় ঐক্য প্রক্রিয়ার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ম্যাডাম কারাগারে যাওয়ার পর মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটি সদস্যরা যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তখন তিনি চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন। জাতীয় নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন সময় তাদের বক্তব্যে তা উল্লেখ করেছেন।
এরপর বিএনপি চেয়ারম্যান (সাবেক ভারপ্রাপ্ত) সরাসরি তদারকিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুজন সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে (প্রয়াত) সঙ্গে করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট রেখেই অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে যৌক্তিকভাবে তৈরি করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, যার অগ্রভাগে ছিলেন সংবিধান প্রণেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন।
বলা চলে নিয়তির টানেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে এই লড়াইয়ের সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে যেমন কাজ করতে হয়েছে, এখনও একনিষ্ঠভাবে তিনি লক্ষ্য স্থির রেখে ধৈর্যের সঙ্গে সঠিক পদক্ষেপ রেখে গুরুদায়িত্ব এখনও পালন করে যাচ্ছেন। বিশেষত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যা ঘটেছে, সেখানে তিনি নিজেই নিজের পথপ্রদর্শক।
গণতন্ত্রের প্রতীক দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অভিভাবক স্থানে রেখে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে দেশ ও দলের জন্য উজ্জ্বল এক যাত্রাপথ রচনা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্রহীন বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনে প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠা ম্যাডাম খালেদা জিয়ার নবদিগন্তের সূচনা বড় সাফল্য ছিল। তার এই সাফল্যের ছায়ায় বিএনপি মহাসচিব ২০২৪ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন দুই অর্জন সঙ্গী করে হয়ে উঠলেন কীর্তিমান।
প্রথমত আওয়ামী সরকার ২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করার গভীর ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে এবং দলের স্বার্থ রক্ষায় বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন নিজে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে।
দ্বিতীয়ত দেশে লাগামহীন দুর্নীতি, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সংকটসহ যেখানে সরকার সর্বত্রই ব্যর্থ, সেখান থেকে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তুলেন। গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ‘সরকারবিরোধী ঐক্য গঠন’, আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করানো, দেশনেত্রীর মুক্তি, বিএনপি চেয়ারম্যানকে সম্মানজনকভাবে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করানো এবং নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক ঐক্য নিয়ে সরকার গঠন করেন।
প্রথম রাজনৈতিক সংগ্রামের পর দ্বিতীয় এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে অর্থনীতির শিক্ষক, ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞান থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির ক্রান্তিকাল পরিভ্রমণ শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হয়ে উঠছেন একজন কীর্তিমান।
লেখক : সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিকর্মী