বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের বাধ্যবাধকতা কিংবা রসহীন কিছু সংখ্যার খতিয়ান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাজেট-পরবর্তী একটি বছরে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের অলিখিত দলিল। বাজেট ভাবনায় রাষ্ট্র যখন প্রবৃদ্ধির চিত্র আঁকে, সীমিত আয়ের মানুষ তখন হিসাব কষে তার নিত্যদিনের বাজারের থলেটি আদৌ ভরবে কি না।
প্রতি বছরই নতুন বছরের বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে আশঙ্কা জাগে- এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কি শুধু বড় পুঁজির বিকাশ ঘটাবে, নাকি সাধারণ মানুষের পকেটে ও নিত্যদিনের জীবনযাপনে স্বস্তির হাওয়া দেবে? নতুন অর্থবছরের বাজেটে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আকাশচুম্বী বিলাসিতার কোনো প্রত্যাশা নেই; আছে কেবল আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারগুলোর যৌক্তিক নিশ্চয়তা পাওয়ার অভিলাষ। এ ক্ষেত্রে বাজেট পরিকল্পনায় গণমানুষের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা রয়েছে।
এক. বর্তমান সময়ে আপামর জনসাধারণের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ হলো অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি। সাধারণ মানুষের আয়ের রেখাচিত্র স্থবির থাকলেও ব্যয়ের গতি ঊর্ধ্বমুখী। সেই সঙ্গে বিভিন্ন পেশাজীবীর মধ্যে আয়বৈষম্যের জাঁতাকল তো আছেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বছর বছর সরকারি চাকরিজীবীদের কয়েকগুণ বেতন বৃদ্ধি পেলেও বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সাধারণত ওই হারে বাড়ে না। ফলে সমাজের বড় একটা অংশের মধ্যে আয়বৈষম্য প্রতি বছরই বৃদ্ধি পেতে থাকে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাজেটে বাজার সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট তৈরিকারীদের কঠোর হস্তে দমন করাসহ আয়বৈষম্য কমাতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও প্রশাসনিক বরাদ্দ রাখা দরকার। পাশাপাশি, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির ফলে বর্তমান করমুক্ত আয়ের সীমা নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বাস্তবসম্মতভাবে বাড়ানো উচিত, যাতে সাধারণ চাকরিজীবী ও সীমিত আয়ের মানুষ কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পায়।
দুই. যেকোনো টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। সাধারণ জনগণ কেবল ইট-পাথরের মেগা প্রজেক্টমুখী বাজেট চায় না; জনগণ চায় মানবসম্পদ গড়ার বাজেট। ফলে আগামী বাজেটে শিক্ষকদের মানসম্মত জীবনযাত্রার উপযোগী বেতন-ভাতা এবং তরুণদের কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলার জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা আবশ্যক।
অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর দেশের অসংখ্য নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী তো চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দকে অবকাঠামো নির্মাণের গণ্ডি থেকে বের করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মূল্য হ্রাস এবং একটি কার্যকর ‘জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা’ চালুর রোডম্যাপ তৈরিতে কাজে লাগানো উচিত। পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে সার, বীজ ও সেচ ব্যবস্থার জন্য পর্যাপ্ত ভর্তুকি ও প্রান্তিক কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা রাখতে হবে। কৃষক না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না। কারণ কৃষকের ওপরই দেশের খাদ্য নিরাপত্তার বড় অংশ নির্ভরশীল।
তিন. শিল্পের বিকাশ এবং জনজীবনের স্বস্তির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ। তবে এই খাতে কেবল আমদানিনির্ভরতা কিংবা রেন্টাল-কুইক রেন্টাল ব্যবস্থার পেছনে জনগণের করের টাকার অপচয় বন্ধ করতে হবে। আগামী বাজেটে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি বা জ্বালানি আমদানির বরাদ্দ কমিয়ে দেশীয় গ্যাস ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে বিশেষ প্রণোদনা ও শুল্ক ছাড় দেওয়া দরকার, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ক্রমবর্ধমান দামের বোঝা আর চেপে না বসে।
চার. দেশে বেকারত্বের হার আশঙ্কাজনক। প্রতি বছর লাখ লাখ উচ্চ শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের দুর্বিষহ বৃত্তে প্রবেশ করে। দেশে এত বড় বেকার জনগোষ্ঠী রেখে রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই আগামী বাজেট হওয়া উচিত কর্মসংস্থানমুখী। তরুণ প্রজন্ম যাতে কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হয়ে নিজেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, সে জন্য সহজশর্তে সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা এবং নতুন উদ্যোগগুলোর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর মওকুফ সুবিধা আরও সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন।
পাঁচ. একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, জীবনমান উন্নয়ন, সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারসহ সবকিছু ভেস্তে যাবে, যদি দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব ভূলুণ্ঠিত হয়। তাই বাজেট প্রণয়নে দেশের প্রতিরক্ষা খাতে বিশেষ নজর দিতে হবে। বর্তমান পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে নজর দিতেই হবে। বাংলাদেশের ঘাড়ে বহু শত্রু নিশ্বাস ফেলছে। দুর্বল প্রতিপক্ষ সবসময় সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়। তাই বাংলাদেশকে দুর্বল প্রতিপক্ষ সেজে অলস সময় কাটানোর সুযোগ নেই।
ফলে আঞ্চলিক টানাপোড়েন ও ভারতসহ যেকোনো দেশের আধিপত্যবাদ মোকাবিলা, সীমান্ত সুরক্ষা, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে নির্মূল করাসহ দেশের সামগ্রিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তিগত নজরদারি নিশ্চিত করা অবশ্য করণীয়। এ জন্য আধুনিক সমরাস্ত্র ক্রয়সহ সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখতে হবে। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি বা অভ্যন্তরীণ বড় সংকটে সশস্ত্র বাহিনীর লজিস্টিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যাপারটিও বাজেট বরাদ্দে অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রতিটি বরাদ্দ ও ব্যয় যেন সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় থাকে, সেটাও নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিশেষে, কোনো বাজেট যদি সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রতিফলন না ঘটাতে পারে, তবে মাথাপিছু আয়বৃদ্ধির গল্প, প্রবৃদ্ধির নিছক পরিসংখ্যান কেবল খসখসে পরিসংখ্যান হয়েই থাকবে। সাধারণ মানুষ এমন বাজেট চায়, যা সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে একটি কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে।
লেখক ও গবেষক
এএডি/