কবর পাকা হয়নি। টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। কমিটি হয়েছে, কিন্তু পরিবার জানে না। আর যে দলের নেতারা একসময় শহীদদের নিয়ে গলা ফাটিয়েছিলেন, তাঁরাই এখন নাকি চেনেন না শহীদকে।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ দেওয়া গাইবান্ধার ৬ শহীদের পরিবার এই ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে সোমবার (১৫ জুন) সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েছিল। গাইবান্ধা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে শহীদ পরিবারগুলো কবর নির্মাণের বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগ তুলে দোষীদের বিচার দাবি করেছে। পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি’র জেলা নেতাদের বিরুদ্ধে শহীদদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনে সহায়তার অভিযোগ এনেছে তারা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের মা শাহিনা বেগম। তিনি জানান, জেলার ৬ শহীদের কবর পাকা করার কাজ বহু আগে শুরু হলেও এখন পর্যন্ত একটিও সম্পূর্ণ হয়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার ও ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক মেহেদী হাসানকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
পরবর্তীতে জেলা পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, মেহেদী হাসান ইতোমধ্যে সব বিল তুলে নিয়ে গেছেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হলে তিনি সমাধানের আশ্বাস দেন, কিন্তু আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
শাহিনা বেগম প্রশ্ন রাখেন, যে সন্তান দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, তার কবরটুকু সম্মানের সঙ্গে পাকা করার টাকাও আত্মসাৎ হয়ে যাবে, এটা কি মেনে নেওয়া যায়?
শহীদদের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২ জুন জাতীয় নাগরিক পার্টি গাইবান্ধা জেলা শাখার ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে দলটির সদস্য সচিব রাহাত ইবনে এমন বক্তব্য দেন যে তিনি জুলাই আন্দোলনের শহীদ সজলকে চেনেন না। এ ঘটনা শহীদ পরিবারকে গভীরভাবে আহত করেছে।
শাহিনা বেগম বলেন, যে ছেলের রক্তের উপর দিয়ে এই নেতারা রাজনীতির মঞ্চে উঠেছেন, সেই ছেলেকেই তারা চেনেন না, এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হতে পারে?
লিখিত বক্তব্যে আরও জানানো হয়, গাইবান্ধায় জুলাই শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাবেক জেলা প্রশাসক চৌধুরী মোয়াজ্জম আহমদের সভাপতিত্বে গঠিত এই কমিটিতে কারা আছেন, তা শহীদ পরিবারগুলো জানতই না। পরে জানা যায়, শহীদ সজলের মা শাহিনা বেগমের নাম সেখানে রাখা হয়েছে, তবে কোন পদে তাও তাকে জানানো হয়নি।
পরিবারগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই কমিটির কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হলে তার দায় শহীদ পরিবারের ওপর চাপানো যাবে না, বলেও জানানো হয়েছে শহীদদের পরিবারের পক্ষ থেকে।
শাহিনা বেগম অভিযোগ করেন, জুলাই শহীদ ও আহতদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করে গাইবান্ধায় এনসিপি নেতারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনে সহায়তা করছেন। এর প্রতিবাদে ৬ শহীদ পরিবার সম্মিলিতভাবে গাইবান্ধায় এনসিপিকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেছে।
এছাড়া পরিবারগুলো প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তার জোর দাবি জানিয়েছে। তারা বলছেন, বিভিন্নভাবে তাদের নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শহীদ শাকিনুরের স্ত্রী শারমিন আক্তার, শহীদ আরিফুলের স্ত্রী হালিজা বেগম, শহীদ সুজনের স্ত্রী লাইজু বেগম, শহীদ নাজমুলের মা গোলেভান, শহীদ জুয়েল রানার মা জমিলা বেগম এবং শহীদ সজলের বাবা খলিলুর রহমান।
অভিযুক্ত ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক মেহেদী হাসানের সাথে যোগাযোগ করে হলে তিনি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি এবং প্রশাসন ও শহীদ পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত বাকি কাজ শেষ করা হবে।
তবে শহীদ পরিবারগুলো এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। তারা বলছে, কাজ না করেই বিল তোলা হয়েছে, এটি নথিপত্রেই স্পষ্ট। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তদন্ত ও দোষীদের বিচার না হলে তারা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গাইবান্ধায় যে ৬ জন প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁদের পরিবার এখনও ন্যায়বিচার, সম্মান ও নিরাপত্তার অপেক্ষায়।
সময়ের আলো/আতা