ফুটবল বিশ্বে আর্জেন্টিনা মানেই গৌরব, আবেগ এবং ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য নাম। তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এই দলকে ঘিরে বিশ্বকাপ মঞ্চে বরাবরই থাকে বাড়তি আকর্ষণ। ২০২৬ বিশ্বকাপও তার বাইরে নয়। আলজেরিয়ার বিপক্ষে আসন্ন ম্যাচ ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্য, লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ অধ্যায় এবং বাংলাদেশি সমর্থকদের বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া পরিচিতি। বিশেষ করে ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর বাংলাদেশে-আর্জেন্টিনা ভক্তদের উচ্ছ্বাস আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও জায়গা করে নেয়, যা তাদেরকে বিশ্ব ফুটবল সংস্কৃতিতে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
আর্জেন্টিনা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল দল। তারা এখন পর্যন্ত তিনবার বিশ্বকাপ জয় করেছে ১৯৭৮, ১৯৮৬ এবং ২০২২ সালে। ১৯৭৮ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথম শিরোপা জয়ের মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলে শক্ত অবস্থান তৈরি করে দলটি। এরপর ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো মারাডোনার নেতৃত্বে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। সেই আসরের ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।
দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে ২০২২ সালে। কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে ফ্রান্সকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আলবিসেলেস্তেরা। প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হারের ধাক্কা সামলে মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছায় লাতিন জায়ান্টরা। ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের সেই যাত্রা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প হয়ে আছে।
আর্জেন্টিনা ফুটবলের সর্বকালের সেরা নাম লিওনেল মেসি। জাতীয় দলের হয়ে ১১৭ গোল করা এই মহাতারকা দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপে অভিষেকের পর তিনি পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলেছেন এবং ২০১৪ ও ২০২২ সালে দলকে ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা ঘোচান ফুটবল বিশ্বের ম্যাজিকাল হিরো লিও মেসি।
বিশ্বকাপে মেসির ব্যক্তিগত অর্জনও অসাধারণ। তিনি দুবার গোল্ডেন বল জিতেছেন (২০১৪ ও ২০২২)। কাতার বিশ্বকাপে ৭ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট করে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। ২০২৬ বিশ্বকাপ তার ষষ্ঠ আসর, যেটি তার নিজস্ব একটি অনন্য রেকর্ড। কোথায় থামবেন মেসি, বিশ্বমঞ্চে কি আর আকাশি-সাদায় দেখা যাবে। কোটি টাকার কোটি প্রাণের এই প্রশ্নের যদিও সদুত্তর এখনও আসেনি। মেসি নিজেও এ ব্যাপারে ঘোষণা দেননি। তবে অনেকের বিশ্বাস, এটিই হতে যাচ্ছে তার শেষ বিশ্বকাপ।
২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও ছিল আর্জেন্টিনার আধিপত্য। দক্ষিণ আমেরিকার কঠিন প্রতিযোগিতায় তারা শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়। ব্রাজিলকে ৪-১ গোলে হারানো ছিল বাছাইপর্বের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। দলটির শক্তিশালী রক্ষণ, দ্রুত ট্রানজিশন এবং কার্যকর আক্রমণের মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। নিয়মিত করে যাচ্ছে।
কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা পেয়েছে নতুন পরিচয়। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা ও ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে তিনি দলটিকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী ইউনিটে পরিণত করেছেন। মেসিনির্ভরতা কমিয়ে পুরো দলকে সমন্বিত শক্তিতে রূপ দেওয়াই তার সবচেয়ে বড় সাফল্য।
তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের আগে একটি দুশ্চিন্তার খবরও রয়েছে। অভিজ্ঞ লেফট-ব্যাক নিকোলাস তাগলিয়াফিকো ইনজুরির কারণে আলজেরিয়ার বিপক্ষে খেলতে পারবেন না। তার পরিবর্তে একাদশে ফাকুন্দো মেদিনাকে দেখা যেতে পারে। স্বস্তির খবরও আছে। দলের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ পুরোপুরি ফিট হয়ে ফিরেছেন এবং গোলবারের নিচে তার খেলার সম্ভাবনাই বেশি।
বর্তমান আর্জেন্টিনা দল অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেলে গড়া। এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো ডি পল, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, লাউতারো মার্টিনেজ ও জুলিয়ান আলভারেজের মতো তারকারা দলটিকে আরও শক্তিশালী করেছে। গোলবারে মার্টিনেজের উপস্থিতি এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা আর্জেন্টিনাকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেবে।
তবে প্রতিপক্ষ আলজেরিয়াকেও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দলটি দুবার আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জিতেছে এবং অতীতে বিশ্বকাপেও নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছে। ২০১৪ বিশ্বকাপে তারা শেষ ষোলোতে পৌঁছে জার্মানিকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াই করতে বাধ্য করেছিল। আলজেরিয়ার সবচেয়ে বড় তারকা রিয়াদ মাহরেজ। ইউরোপীয় ফুটবলে দীর্ঘদিন সাফল্যের সঙ্গে খেলা এই উইঙ্গার এখনও জাতীয় দলের আক্রমণের প্রধান ভরসা। তার সঙ্গে রয়েছেন আমিন গুইরি, মোহাম্মদ আমৌরা ও তরুণ প্রতিভা ইব্রাহিম মাজা। দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক, শারীরিক শক্তি এবং কারিগরি দক্ষতাই আলজেরিয়ার মূল অস্ত্র।
সব মিলিয়ে বলা যায়, একদিকে আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক আক্রমণ ও টেকনিক্যাল দক্ষতা, অন্যদিকে আলজেরিয়ার শৃঙ্খলা ও প্রতিরোধ এই দুইয়ের টানটান লড়াইয়েই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হতে পারে।
দুই দলের মুখোমুখি ইতিহাস খুব বেশি সমৃদ্ধ নয়, মাত্র একবার দেখা হয়েছে তাদের। ২০০৭ সালের সেই প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৪-৩ গোলে জয় পেয়েছিল। সেই ম্যাচেই তরুণ মেসি নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক জোড়া গোল করেছিলেন। দুই দলের র্যাঙ্কিংয়ের রয়েছে আকাশ-পাতাল বিভেদ। আর্জেন্টিনা যেখানে ১ নম্বরে, সেখানে আলজেরিয়ার অবস্থান ২৮।
বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নতুন অভিযানের সূচনা, মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপের আরেকটি অধ্যায় এবং আলজেরিয়ার জন্য নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের বড় মঞ্চ। তাই কানসাস সিটির এই ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে।
টুকাটুকি :
র্যাঙ্কিং
আর্জেন্টিনা ১
আলজেরিয়া ২৮
দু’দলের পূর্ব সাক্ষাৎ
আর্জেন্টিনা ১ জয়
আলজেরিয়া ০
ভেন্যু :
কানসাস, যুক্তরাষ্ট্র
সেরা তারকা
লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা
রিয়াদ মাহরেজ (আলজেরিয়া)