বর্ষার এই দিনগুলোতে প্রকৃতি যেমন নিজেকে বৃষ্টিধারায় ধুয়ে-মুছে সতেজ ও সবুজ করে নেয় তেমন আপনার প্রতিদিনের ফ্যাশন, জীবনযাত্রা এবং সাজেও থাকুক সেই সজীবতার স্নিগ্ধ ছাপ। সঠিক কাপড়ের নির্বাচন, ছিমছাম মেকআপ আর সামান্য সতর্কতার সঠিক সমন্বয়ে মেঘ-বৃষ্টির এই দিনগুলো হয়ে উঠুক আরও রঙিন, উৎসবমুখর ও আনন্দময়।
আষাঢ়ের ঝিরঝিরে বৃষ্টির মায়াবী ছোঁয়ায় তপ্ত প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। জানালার বাইরে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ, কদম ফুলের সুবাস আর মেঘলা আকাশ- এই রূপ মনে এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে যায়। তবে বর্ষায় বাইরের কর্দমাক্ত রাস্তা আর হুটহাট বৃষ্টির হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পোশাক নির্বাচন ও সাজগোজের ক্ষেত্রে চাই বাড়তি সতর্কতা ও সেই সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া।
বর্ষার উপযোগী পোশাক
নির্বাচন ও রঙের খেলা
বর্ষাকালের আবহাওয়া কখনো মেঘলা, কখনো বৃষ্টি, আবার কখনো ভীষণ আর্দ্র ও ভ্যাপসা গরম। তাই এই সময়ে পোশাক নির্বাচনে এককভাবে ফ্যাশনকে অনুসরণ না করে আরাম, কাপড়ের স্থায়িত্ব ও উপযোগিতাকে প্রাধান্য দেওয়া সবচেয়ে জরুরি।
বর্ষায় মোটা বা ভারী জিন্স, খাদি কাপড় এড়িয়ে চলা ভালো। এগুলো ভিজলে সহজে শুকাতে চায় না এবং শরীরে স্যাঁতসেঁতে অনুভূতি তৈরি করে। সিনথেটিক বা কৃত্রিম তন্তুর পোশাক, যেমন ক্র্যাপ, সিল্ক বা সেমি-ফরমিং ফেব্রিক এই সময়ের জন্য বেশ উপযোগী। কারণ এগুলো খুব দ্রুত শুকায় এবং কাদা লাগলেও সহজে দাগ বসে না। তবে যদি আপনি দীর্ঘ সময় বাইরে কাটান তবে গরমের অস্বস্তি এড়াতে হালকা সুতি বা লিনেন পোশাক আরামদায়ক হয়ে থাকে।
বর্ষার দিনে সাদা বা একদম অফ-হোয়াইট রঙের পোশাক এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ রাস্তার নোংরা জল বা কাদার দাগ এতে দ্রুত ফুটে ওঠে এবং পোশাকটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
একইভাবে খুব কালচে রঙের পোশাকও মেঘলা দিনে মন খারাপের আবহ তৈরি করে। এর বদলে প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নীল, রয়্যাল ব্লু, সি-গ্রিন, লেমন, ফিরোজা কিংবা কলাপাতা সবুজের মতো সজীব রং বেছে নিতে পারেন। বৃষ্টির ধূসর ও বিষণ্ন প্রকৃতির মাঝে এই উজ্জ্বল রংগুলো আপনাকে ভিড়ের মাঝেও দারুণ সতেজ ও প্রাণবন্ত করে তুলবে।
বর্ষার দিনগুলোতে লম্বা কুর্তি এড়িয়ে কিছুটা খাটো দৈর্ঘ্যের পোশাক (কুর্তি, টিউনিক বা সেমি-ফরমাল ট্রাউজার) পরা সুবিধাজনক। এতে রাস্তার কাদা কাপড়ের নিচের অংশে লাগার ভয় থাকে না। একরঙা পোশাকের চেয়ে ছোট বা মাঝারি ফ্লোরাল ও জ্যামিতিক প্রিন্টের পোশাক এই সময়ে বেশি মানানসই। কারণ হুটহাট বৃষ্টিতে পোশাকের কোনো অংশ ভিজে গেলেও প্রিন্টের কাপড়ে তা সহজে নজরে আসে না।
বর্ষার কোনো উৎসব বা আড্ডায় যারা শাড়ি পরতে ভালোবাসেন, তারা সুতি এড়িয়ে জর্জেট, শিফন বা মসলিন শাড়ি বেছে নিতে পারেন। এগুলো ভিজলেও যেমন দ্রুত শুকায়, তেমনি শরীরে লেপ্টে থাকে না।
বর্তমানে প্রিন্টেড শাড়ির সঙ্গে একরঙা ব্লাউজ বা ফুলেল মোটিফের ব্লাউজ পরার বেশ ট্রেন্ড চলছে। বর্ষার গুমোট গরমে আরাম পেতে হাতা কাটা , থ্রি-কোয়ার্টার বা কনুই পর্যন্ত হাতার ব্লাউজে গোল, বোট গলার নকশা কিংবা ‘হাই-নেক’ কাট বর্ষার সাজে এক আধুনিকতা যোগ করে।
ছিমছাম সাজ
বর্ষার সাজ হতে হবে হালকা, স্নিগ্ধ এবং অবশ্যই ওয়াটারপ্রুফ। এই ঋতুতে ভারী মেকআপ বৃষ্টির জল কিংবা ঘামে গলে গিয়ে এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
বৃষ্টির দিনে সাধারণ কাজলের বদলে ওয়াটারপ্রুফ আইলাইনার ও মাসকারা ব্যবহার করা ভালো। চিরাচরিত কালো রঙের বাইরে গিয়ে চোখের নিচের পাতায় গাঢ় নীল বা সবুজ কাজল ব্যবহার করতে পারেন, যা বর্ষার আমেজের সঙ্গে দারুণ মানায়। চোখের সাজে আইশ্যাডোর ক্ষেত্রে খুব চকচকে বা গ্লিটারি রং বাদ দিয়ে ছাই, হালকা বাদামি বা ম্যাট গোলাপি রঙের ছোঁয়া আনলে চোখ জোড়া সতেজ ও আকর্ষণীয় দেখাবে। ত্বকের বেস মেকআপের জন্য ভারী ফাউন্ডেশন বাদ দিয়ে কেবল হালকা বিবি ক্রিম ও ফেস পাউডার ব্যবহার করাই যথেষ্ট।
বর্ষার আর্দ্রতায় চুল ছেড়ে রাখলে তা ঘেমে জট পাকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই চুল আলতো করে খোঁপা, ফ্রেঞ্চ বিনুনি বা পনিটেইল করে বেঁধে রাখাই ভালো। সাজে বাঙালিয়ানা ও উৎসবের আমেজ আনতে খোঁপা বা বিনুনিতে কদম, রঙ্গন, জুঁই বা সুগন্ধি বেলি ফুলের মালা গুঁজে দিতে পারেন। সবশেষে কপালে পোশাকের সাথে মিলিয়ে ছোট্ট একটি টিপ আর হালকা লিপস্টিক বর্ষার সাজকে পূর্ণতা দেবে।
স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় পোশাকের যত্ন
বর্ষায় শুধু সুন্দর পোশাক পরাই শেষ কথা নয়, ভেজা পোশাক সঠিকভাবে শুকানো এবং আলমারিতে রাখা কাপড়ের গুণগত মান বজায় রাখা এই সময়ে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একটু অসতর্কতায় পোশাকে ফাঙ্গাস বা ছত্রাক পড়ে তা নষ্ট হতে পারে। বাইরে থেকে বৃষ্টিতে ভিজে বা সামান্য স্যাঁতসেঁতে হয়ে ফিরেই পোশাক কখনো আলমারিতে বা লন্ড্রি বাস্কেটে স্তূপ করে রাখা উচিত নয়। প্রথমে বাতাসে বা ফ্যানের নিচে রেখে কাপড়টি সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিন। ভালোভাবে শুকানোর পরেই তা ড্রয়ারে বা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখুন। আর্দ্রতার কারণে আলমারি বা ড্রয়ারে রাখা কাপড়ে ভ্যাপসা ও দুর্গন্ধ হতে পারে। তাই সুযোগ পেলেই আলমারির দরজা কিছুক্ষণের জন্য খোলা রাখুন যেন ভেতরে বাতাস চলাচল করতে পারে। কাপড়ের ভাঁজে ন্যাপথলিন, সিলিকা জেল বা শুকনো নিমপাতা রাখতে পারেন, যা আর্দ্রতা শুষে নেয় এবং পোকা-মাকড় ও ছত্রাক থেকে সুরক্ষা দেয়। বর্ষার এই দিনগুলোতে প্রকৃতি যেমন নিজেকে বৃষ্টিধারায় ধুয়ে-মুছে সতেজ ও সবুজ করে নেয় তেমন আপনার প্রতিদিনের ফ্যাশন, জীবনযাত্রা ও সাজেও থাকুক সেই সজীবতার স্নিগ্ধ ছাপ। সঠিক কাপড়ের নির্বাচন, ছিমছাম মেকআপ আর সামান্য সতর্কতার সঠিক সমন্বয়ে মেঘ-বৃষ্টির এই দিনগুলো হয়ে উঠুক আরও রঙিন, উৎসবমুখর ও আনন্দময়।
/মহু