কুরাসাও : ক্যারিবিয়ানের রঙিন দ্বীপ থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে

বন্যা নাসরিন

ফিচার

আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন ফুটবল পরাশক্তি জার্মানির বিপক্ষে মাঠে নামবে কুরাসাও, তখন অনেক দর্শকের মনেই প্রশ্ন জাগবে- কোথায় এই কুরাসাও?

2026-06-14T21:05:59+00:00
2026-06-14T21:10:40+00:00
 
  শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১০ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
কুরাসাও : ক্যারিবিয়ানের রঙিন দ্বীপ থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে
বন্যা নাসরিন
প্রকাশ: রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ৯:০৫ পিএম  আপডেট: ১৪.০৬.২০২৬ ৯:১০ পিএম
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত ছোট দেশ এর আগে কোনো আসরে খেলেনি। গ্রাফিক : সময়ের আলো
আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন ফুটবল পরাশক্তি জার্মানির বিপক্ষে মাঠে নামবে কুরাসাও, তখন অনেক দর্শকের মনেই প্রশ্ন জাগবে- কোথায় এই কুরাসাও? এই নতুন দেশটি সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। চলুন জেনে নেওয়া যাক, ক্যারিবিয়ানের রঙিন দ্বীপ থেকে এক ঝাঁক স্বপ্নবাজ খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপের মঞ্চে উঠে আসার গল্প।

ক্যারিবিয়ান সাগরের নীল জলের মাঝে, ভেনেজুয়েলার উপকূল থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ছোট্ট একটি দ্বীপদেশ কুরাসাও। আয়তন মাত্র ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার। অথচ এই ক্ষুদ্র দেশই আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরে নিজের পতাকা তুলে ধরবে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে জনসংখ্যা বা আয়তনের দিক থেকে এত ছোট দেশ এর আগে কোনো আসরে খেলেনি। একসময় ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৫০-এর বাইরে থাকা দলটি আজ বিশ্বের সেরা ৪৮ দলের একটি।

ক্যারিবিয়ানের রঙিন দ্বীপ থেকে উঠে আসা এক ঝাঁক স্বপ্নবাজ খেলোয়াড়।

ক্যারিবিয়ানের রঙিন দ্বীপ থেকে উঠে আসা এক ঝাঁক স্বপ্নবাজ খেলোয়াড়।


কুরাসাও স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; এটি কিংডম অব নেদারল্যান্ডের একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশ। কুরাসাও দুটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত- মূল দ্বীপ কুরাসাও ও ছোট্ট জনবসতিহীন দ্বীপ ক্লেইন কুরাসাও, যেটি মূল দ্বীপের প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলিস ভেঙে যাওয়ার পর কুরাসাও নিজস্ব সরকার ও সংসদ নিয়ে নতুন সাংবিধানিক মর্যাদা পায়। দেশটির প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক নীতির মতো কিছু বিষয় এখনও নেদারল্যান্ডসের অধীনে রয়েছে।

কুরাসাও নামটির উৎস নিয়ে একাধিক তত্ত্ব আছে। একটি তত্ত্ব মতে, নামটি এসেছে পর্তুগিজ ‘coração’ থেকে, যার অর্থ হৃদয়। আরেকটি তত্ত্ব বলে, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় অসুস্থ নাবিকদের এই দ্বীপে রেখে যাওয়া হতো। এখানকার ফলমূল খেয়ে তারা সুস্থ হয়ে উঠতেন। তাই পর্তুগিজ ‘cura’ অর্থ নিরাময় থেকেও নামটি এসে থাকতে পারে। অবশ্য অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মনে করেন, এখানকার আদিবাসীরা নিজেদের যে নামে পরিচয় দিতেন, সেখান থেকেই এসেছে দেশটির নাম। 

সমুদ্রতীরের ডাচ ধাঁচের রঙিন বাড়ি।

সমুদ্রতীরের ডাচ ধাঁচের রঙিন বাড়ি।


কুরাসাওয়ের সরকারি ভাষার নাম পাপিয়ামেন্তো। তবে, এখানকার দাসদের মধ্যে একসময় একটি গোপন ভাষাও প্রচলিত ছিল, যার নাম ‘গুয়েনে’। বর্তমানে দেশটিতে ৫০টিরও বেশি জাতীয়তার মানুষ বাস করেন এবং অধিকাংশ মানুষ অনায়াসে চার থেকে পাঁচটি ভাষায় কথা বলতে পারেন। রাস্তায় হাঁটলে একই কথোপকথনে একাধিক ভাষার ব্যবহার শুনে তাই অবাক হওয়া স্বাভাবিক।

পাপিয়ামেন্তো ভাষার বহুল ব্যবহৃত শব্দ, ‘ডুশি’, যার অর্থ মিষ্টি, সুন্দর বা ভালো। সুস্বাদু খাবার, সুন্দর দৃশ্য, প্রিয় মানুষ কিংবা ভালো কোনো অনুভূতি বর্ণনা করতেও এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। দেশটিতে দোকানের সাইনবোর্ড, রেস্তোরাঁর নাম, রাস্তার দেয়ালচিত্র, এমন অনেক জায়গায় এ শব্দের ব্যবহার হরহামেশা চোখে পড়ে।


কুরাসাওয়ের রাজধানী উইলেমস্টাড যেন জীবন্ত চিত্রকর্ম। সমুদ্রতীরের ডাচ ধাঁচের রঙিন বাড়িগুলো এতটাই বিখ্যাত যে, ১৯৯৭ সালে তা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পেয়েছে। একসময় এই ভবনগুলো ছিল ধবধবে সাদা। রোদের ঝলকানিতে চোখের ক্ষতি এবং তার ফলে সৃষ্ট মাথাব্যথার কারণে ১৮১৭ সালে গভর্নর আলবার্ট কিককার্ট সাদা রং নিষিদ্ধ করেন। এ শহরের আরেকটি আকর্ষণীয় স্থাপনা হলো, সেন্ট আনা বে-র ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কুইন এমা ব্রিজ। ১৮৮৮ সালে নির্মিত এই ব্রিজকে স্থানীয় লোকজন ডাকেন ‘সুইঙ্গিং ওল্ড লেডি’। জাহাজ আসার সময় ব্রিজটি সরে যায়।

সেন্ট আনা বে-র ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কুইন এমা ব্রিজ।

সেন্ট আনা বে-র ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কুইন এমা ব্রিজ।


ক্যারিবিয়ানের অন্যতম বড় ও দীর্ঘস্থায়ী কার্নিভ্যাল হয় এই ছোট্ট দেশটিতে। প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ধরে চলে উৎসব। আফ্রিকান, ইউরোপীয়, লাতিন আমেরিকান ও ক্যারিবিয়ান সংস্কৃতির এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায় তখন। 

কুরাসাও মানেই সাদা বালুর সৈকত, ফিরোজা রঙের পানি ও প্রবালপ্রাচীর। পর্যটন আজ দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ডাইভিং, স্নোরকেলিং ও সমুদ্র ভ্রমণের জন্য বিশ্বের সেরা দ্বীপগুলোর একটি হিসেবে কুরাসাওর নাম উচ্চারিত হয়। দেশটিতে প্রায় ৪০টি সমুদ্রসৈকত আর ৬০টি ডাইভিং স্পট আছে।

বেসবল খেলার মাধ্যমে নিজেদের অনন্য পরিচিতি দিয়েছে কুরাসাও। ১৯৮৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এই দেশ থেকে ১৭ জন মেজর লিগ বেসবল খেলোয়াড় উঠে এসেছেন। এখন ফুটবলেও ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি। একসময় আন্তর্জাতিক ফুটবলে কুরাসাও ছিল প্রায় অচেনা নাম। কিন্তু নেদারল্যান্ডসে বেড়ে ওঠা কুরাসাও বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দলটি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ৭৮ বছর বয়সী অভিজ্ঞ কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের অধীনে তারা ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়। 

আজ জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচে ফল যা-ই হোক, কুরাসাও এর মধ্যেই জয়ী। কারণ ফুটবলের এ মঞ্চ বিশ্বের মানচিত্রে নতুন করে পরিচিত করেছে দেশটিকে। আজকের ম্যাচে তাই অনেক নিরপেক্ষ দর্শক হয়ত জার্মানির তারকা খেলোয়াড়দের পাশাপাশি খুঁজে নেবেন সেই ক্ষুদ্র দ্বীপের সাহসী ফুটবলারদেরও- যারা প্রমাণ করেছে, স্বপ্নের আকার কখনও দেশের আকার দিয়ে মাপা যায় না!

/মহু

  বিষয়:   কুরাসাও  ক্যারিবিয়ান  দ্বীপ  বিশ্বকাপ  ফুটবল 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: