না থেকেও বিশ্বকাপে বাংলাদেশ

মামুন হোসেন

খেলা

বিশ্বকাপ ফুটবল আসরে কবে খেলবে বাংলাদেশ? আদৌ কি খেলতে পারবে! কেন বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় না? ফুটবলবোদ্ধাদের কাছে এর উত্তর

2026-06-11T01:43:23+00:00
2026-06-11T01:43:23+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬,
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
খেলা
না থেকেও বিশ্বকাপে বাংলাদেশ
মামুন হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ১:৪৩ এএম   (ভিজিট : ১১)
বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের পতাকা কেনার হিড়িক। ছবি : সময়ের আলো
বিশ্বকাপ ফুটবল আসরে কবে খেলবে বাংলাদেশ? আদৌ কি খেলতে পারবে! কেন বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় না? ফুটবলবোদ্ধাদের কাছে এর উত্তর সহজ হলেও, সাধারণ সমর্থকের এটা দুর্ভেদ্য ঠেকে। বিশ্বকাপের বছরে আফসোস আরও বাড়ে। রাস্তার মোড়ে চা দোকানের আড্ডায় কিংবা অফিস-আদালতে কান পাতলে ভেসে আসে আহা আমরা কবে বিশ্বকাপে খেলব!

৩২ থেকে এবার ৪৮ দেশে উন্নীত হয়েছে আসর। দলের সংখ্যা, ম্যাচ সংখ্যা, ভেন্যু কিংবা আয়োজক (তিন দেশ)- সবখানে এর ব্যাপ্তি বাড়লেও বাংলাদেশের গায়ে এর প্রভাব পড়েনি। সেই ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ সামনে রেখে বাছাইপর্ব খেলা লাল সবুজের দল; ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বিশ্বকাপেও খেলেছে সেই বাছাইপর্বই। অথচ বেশিদিন আগের কথা নয়, ২০১৫ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপ-২০১৮ সামনে রেখে বাছাইপর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডে জর্দানের বিপক্ষে খেলেছিল বাংলাদেশ। এক দশকের ব্যবধানে জর্দান এবার বিশ্বমঞ্চে। বাংলাদেশ আটকে আছে বাছাইপর্বের বেড়াজালে।

ফিফার সদস্য সংখ্যা ২১১। এর মধ্যে ১৬৩ দেশই রয়েছে বিশ্বকাপের বাইরে, বাংলাদেশ সেই তালিকার একটি। সবার ভাগ্যে বিশ্বমঞ্চে খেলার সুযোগ মিলবে বিষয়টা এমন নয়। তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ খেলবে- এমন ভাবনা নিশ্চয়ই দোষের নয়। বিশ্বকাপে না খেলার খেদ হয়তো থাকতে পারে; তাই বলে বিশ্বকাপে যে একেবারে বাংলাদেশ নেই তাও নয়। বরং অংশ নেওয়া ৪৮ দেশের চেয়ে অনেকাংশে এগিয়ে বিশ্বকাপে না খেলা দেশটি। আর সেটা সম্ভব হয়েছে ফুটবলের প্রতি বাংলার সমর্থকদের অকৃত্রিম ভালোবাসায়। যেখানে সেতুবন্ধের কাজটি করেছে দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা।

দেশ স্বাধীনের তিন বছরের মাথায় বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফার সদস্য পদ (১৯৭৪ সালে) লাভ করে বাংলাদেশ। সদস্য হওয়ার ১১ বছর পর বিশ্বকাপের আঁচ গায়ে লাগে। বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা করে নিতে সব দলকেই বাছাইপর্বে খেলতে হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ১৯৮৫ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব খেলে লাল-সবুজরা। এরপর আর ছেদ পড়েনি। গেল ৪০ বছর ধরে টানা বাছাইপর্ব খেলে যাচ্ছে এ দেশের ফুটবলাররা। যদিও সাফল্যের হার বড় নয়, তবে অংশ নেওয়াও তো কম গর্বের নয়। 
  
বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলে না- এটা কেবল কাগজে-কলমের হিসাব। বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মেসি, রোনালদো, ন্যুয়ার, নেইমার, এমবাপেরা মাঠের লড়াইয়ে নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিনিধিত্ব করে পুরো ফুটবল বিশ্বের, পুরো ফুটবল সম্প্রদায়কে ধারণ করে দেশটি। মাঠের বাইরে বসে খেলে বাংলাদেশ। মন-প্রাণ উজাড় করে দূরদেশ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড, স্পেন, জার্মানি কিংবা ইতালি, ইরানের মতো দলকে আকণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে। ভিনদেশের জার্সি গায়ে জড়িয়ে খেলা দেখে তারা। ভিনদেশের পতাকা বাড়ির আঙিনা থেকে পথের ধার, এমনকি বাড়ির ছাদেও শোভা পায়। ভিনদেশের প্রতি অকৃত্রিম, অনিঃশেষ ভালোবাসাপ্রবণ এমন ফুটবল উন্মাদ জাতি অন্য কোথাও মেলা ভার! 

বাংলাদেশ শুধু মাঠের বাইরে বসে খেলা দেখে না, রীতিমতো ফুটবল সমর্থনে ভাগাভাগিতেও মেতে ওঠে। যা অনেক সময় হাতাহাতির পর্যায়েও চলে যায়। বলা হচ্ছে বাংলাদেশের ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কথা। বিশ্বকাপ আসর শুরু হলেই দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এক বাংলাদেশ। কেউ ব্রাজিলের পক্ষ নেয়, কেউবা আর্জেন্টিনার। আশি, নব্বই দশকে শুরু হওয়া উন্মাদনা এখনও চলমান। তবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ছন্দময় ফুটবলের পাশাপাশি বর্তমানে ইউরোপের পাওয়ার ফুটবলেও মজেছে বাংলার ভক্তরা। ফ্রান্সের উত্থান কিংবা ইতালির রক্ষণাত্মক ফুটবলের প্রেমে যেমন অনেকে মত্ত, তেমনি স্পেনের টিকিটাকা, জার্মানি-ইংল্যান্ডের পাওয়ার ফুটবলের ভক্তও এ দেশে অগণিত। তবে সব ছাপিয়ে দুটি নাম বাংলাদেশে জন্ম থেকে জাগরিত- ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা। 

‘না থেকেও বিশ্বকাপে বাংলাদেশ’- বাক্যটা একেবারে অসত্য নয়। বরং এটার মাহাত্ম্য অনেক উঁচুতে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে নিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনায় আজ বিশ্বদরবারে ভাটির দেশকে নতুনভাবে পরিচিতি এনে দিয়েছে। একটা সময় ছিল বাংলাদেশকে চেনাতে হলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নামে চেনাতে হতো। সেই দিন এখন দূরের বাতিঘর। বাংলাদেশ এখন নিজ আলোয় সমুজ্জ্বল। ফুটবলপ্রেমীদের কল্যাণে আজ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার কাছে পরিচিত এক নাম। ২০২২ বিশ্বকাপের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। সেবার চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ওয়েবসাইটেও বাংলার সমর্থকরা জায়গা করে নিয়েছিলেন। মেসি, স্ক্যালোনিরা নতুন করে চিনেছিলেন সবুজ, শ্যামলে সুশোভিত বাংলাদেশকে।

বাংলাদেশের মানুষের লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনার প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা দেখে অভিভূত হয়েছিল খোদ আর্জেন্টিনা সরকার এবং সাধারণ মানুষ। ২০২২ বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং দলের খেলোয়াড়রা সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান। আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশের জন্য গ্রুপ খুলে ক্রিকেট খেলা সাপোর্ট করা শুরু করে। এ ছাড়া দীর্ঘ ৪৫ বছর পর ২০২৩ সালে আর্জেন্টিনা বাংলাদেশে তাদের স্থায়ী দূতাবাস পুনরায় চালু করে। একটি ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে দুটি দেশের সম্পর্ক এভাবে বদলে যাওয়ার নজির ইতিহাসে বিরল।

‘না থেকেও বিশ্বকাপে বাংলাদেশ’-এর অনেক কারণের একটি বাংলাদেশের পোশাক খাত। বিশ্ব বাজারে এ দেশের পোশাকের চাহিদার কথা কারোর অজানা নয়। মেসি, নেইমার, রোনালদোরা যেসব খেলার পোশাক পরিধান করেন, তার অধিকাংশই বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের ঘাম আর শ্রমে তৈরি। বিশ্বখ্যাত স্পোর্টস ব্র্যান্ড অ্যাডিডাস, নাইকি, পুমার অফিসিয়াল জার্সি, শর্টস এবং জ্যাকেট তৈরির জন্য বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। 

বিশ্বকাপ এলে বাংলাদেশে যে ফুটবল উন্মাদনা তৈরি হয়, তা শুধু মাইলের পর মাইল লম্বা পতাকা তৈরি, বাড়ির ছাদে পতাকা ওড়ানোর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না; দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশাল স্ক্রিনে হাজার হাজার মানুষের একসঙ্গে খেলা দেখা পৃথিবীর আর কোনো অ-অংশগ্রহণকারী দেশে এমনটা চোখে পড়ে না। ফুটবলের প্রতি এ দেশের নিবেদনের বিষয়ে খোদ ফিফা অবগত। তাই তো বিশ্বকাপের বছরে স্বর্ণালি ট্রফিটা বাংলাদেশের মানুষ যাতে কাছ থেকে দেখতে পারে, ছবি তুলে স্মৃতিপটে রেখে দিতে পারে, তার জন্য বিশ্বকাপ ট্রফি ট্যুরের ব্যবস্থা করে ফিফা। গেল কয়েক বিশ্বকাপ ধরে এটা নিয়মে পরিণত হয়েছে।

পুরো বিশ্বকে এক সুতোয় গাঁথা, সবার মাঝে ফুটবলীয় আনন্দ-বিনোদন ছড়িয়ে দেওয়াই ফুটবল বিশ্বকাপের মূল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য। আর সেই ভালোবাসার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো বাংলাদেশ। যে দেশটা সরাসরি মাঠে খেলে না কিন্তু ফুটবলের প্রতি তাদের ভালোবাসা, আবেগ, নিবেদন অংশগ্রহণকারী দেশের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   বিশ্বকাপ  বাংলাদেশ  ফুটবল  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: