আষাঢ় মাস। সকাল থেকেই আকাশ কালো। দূরে মেঘের গর্জন। কিছুক্ষণের মধ্যেই নেমে এলো মুষলধারে বৃষ্টি। শহরের মানুষ ছাতা খুঁজছে বা ভিজে কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছে, গ্রামের কৃষক মুখ তুলে তাকাচ্ছে আকাশের দিকে, নদীর মাঝি যাত্রী পারাপারে ব্যস্ত, মাছের আড়তে বাড়ছে ইলিশের দরকষাকষি, অন্যদিকে মোবাইল ফোনের পর্দায় অনলাইন ডেলিভারি অ্যাপ দেখাচ্ছে- ‘ডেলিভারি টাইম কিছুটা বেশি হতে পারে।’ একই বৃষ্টি, অথচ কত ভিন্ন প্রতিক্রিয়া, ভিন্ন আবেদন!
কারও কাছে বৃষ্টি রোমান্টিকতা, কারও কাছে দুর্ভোগ, আবার কারও কাছে আয়-রোজগারের মৌসুম। বাংলাদেশের মতো কৃষি ও নদীনির্ভর দেশে বর্ষাকাল প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে। আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টি মাঠে ফসল ফলায়, নদীতে নতুন মাছ আনে, নৌপথ সরব করে, আবার একইসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সুযোগও তৈরি করে। ছাতা, রেইনকোট, জলরোধী জুতা থেকে শুরু করে অনেককিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বৃষ্টির অর্থনীতি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্ষার সবচেয়ে বড় অবদান কৃষিতে। বছরের পর বছর ধরে গ্রামীণ বাংলার কৃষক আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে। কারণ বর্ষার পানি ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আউশ ও আমন ধান চাষের জন্য আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো বৃষ্টি হলে জমিতে সেচের খরচ কমে যায়, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পায় এবং ফলন বাড়ে।
বাংলাদেশের অসংখ্য কৃষক এখনও প্রকৃতিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা অনুসরণ করেন। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ‘প্রাকৃতিক বিনিয়োগ’ হলো বর্ষার পানি। এই পানি বিনা মূল্যে জমিতে পৌঁছে যায় এবং কোটি কোটি টাকার সেচ ব্যয় বাঁচিয়ে দেয়।
তবে প্রয়োজনীয় বৃষ্টি আশীর্বাদ হলেও অতিবৃষ্টি হয়ে উঠতে পারে অভিশাপ। বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং ফসলের ক্ষতি কৃষকের পুরো বছরের পরিকল্পনাকে ভেঙে দিতে পারে। অর্থাৎ কৃষির জন্য বৃষ্টি যেমন সম্পদ, তেমনি ঝুঁকিও।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের বর্ষা মানেই ইলিশের মৌসুম। আকাশে মেঘ জমার সঙ্গে সঙ্গে নদীর চরিত্র বদলাতে শুরু করে। উজান থেকে নেমে আসা মিঠা পানি ও সমুদ্রের লবণাক্ত জলের মিশ্রণে তৈরি হয় ইলিশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। তাই বর্ষাকালে নদীতে ইলিশের বিচরণ বৃদ্ধি পায়। জেলেরা নৌকা নিয়ে নদীতে নামে। দেশের বিভিন্ন আড়ত, বাজার ও পরিবহন নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে তখন। চাঁদপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা কিংবা বরিশালের নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি এই সময়ে নতুন গতি পায়। শুধুমাত্র ইলিশকে কেন্দ্র করে জেলে, বরফকল, পরিবহন শ্রমিক, মাছ আড়তদার, খুচরা বিক্রেতাসহ আরও বিভিন্ন শ্রেণির অসংখ্য মানুষ উপার্জন করার সুযোগ পায়।
বর্ষাকালে অসংখ্য খাল-বিল ও উপনদী নাব্যতা ফিরে পায়। অনেক অঞ্চলে যেসব পথ শুকনো মৌসুমে অচল হয়ে পড়ে, বর্ষায় সেগুলো নতুন করে ব্যবহারযোগ্য হয়। এতে গ্রামের হাট-বাজারে পণ্য পরিবহন ও যাত্রীদের পারাপার সহজ হয়। নৌযান মালিক, মাঝি, ঘাটশ্রমিক- সবার আয় তাই বর্ষা মৌসুমে বেড়ে যায়।
বর্ষার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি ব্যবসা প্রাণ ফিরে পায়- ছাতা ও রেইনকোট ব্যবসা। বছরের অন্য সময় এসব জিনিস যেকোনও দোকানে সীমিত বিক্রি হয়। কিন্তু বর্ষা এলেই ক্রেতাদের ভিড় দেখা যায়। স্কুলপড়ুয়া শিশু থেকে অফিসগামী কর্মজীবী মানুষ- সবাই বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা পেতে এসব জিনিস সংগ্রহ করে। তাই এ মৌসুমে ফুটপাতের ক্ষুদ্র বিক্রেতা থেকে বড় বিপণিবিতান পর্যন্ত সবাই বিশেষ প্রস্তুতি নেয়। বর্ষাকেন্দ্রিক বাজারে এখন আরও বিভিন্ন ধরনের নতুন পণ্য যুক্ত হয়েছে। যেমন- জলরোধী ব্যাগ ও মোবাইল কভার, রাবারের জুতা, মোটরসাইকেল রেইনস্যুট ইত্যাদি।
ডিজিটাল বাংলাদেশের নতুন অর্থনীতিতে বৃষ্টির আরেকটি প্রভাব দেখা যায় অনলাইন ডেলিভারিতে। ভারী বৃষ্টির দিনে অনেক মানুষ ঘরের বাইরে যেতে চান না। ফলে খাবার, মুদি পণ্য এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অনলাইনে অর্ডার করার প্রবণতা বাড়ে। ফুড ডেলিভারি রাইডারদের জন্য এটি একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। চাহিদা বাড়লেও বৃষ্টিতে রাস্তায় যানজট বাড়ে, জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, ডেলিভারিতে বিলম্ব হয়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। তবুও বৃষ্টির দিনে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর অর্ডার সংখ্যা অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
এ ছাড়া, চায়ের দোকান, ভাজাপোড়ার দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরই বিক্রি বেড়ে যায়। এসব ছোট ছোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো যোগ করলে একটি বিশাল অর্থনৈতিক বাজারের চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশে বর্ষার প্রতি ফোঁটা জল আসলে একটি অর্থনৈতিক গল্প। সেই গল্পের নায়ক কখনও কৃষক, কখনও জেলে, কখনওবা ডেলিভারি রাইডার। তাদের সবার জীবনের স্রোত মিলেমিশে তৈরি করে ‘বাংলাদেশে বৃষ্টির অর্থনীতি’।
/মহু