‘একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর চেয়ে বড় আর কী হতে পারে?’ সেলফোনের ওপার থেকে শোনা এ কথাটা কর্ণগহ্বর ছাড়িয়ে হৃদয়ে এসে স্পর্শ করে গেল। কথাটা বলছিলেন আলাউদ্দিন সালেহ। ২০১৪ সাল থেকে তিনি রক্তদানের মাধ্যমে মানুষের জীবন বাঁচাতে সহযোগিতা করছেন। বিশ্ব রক্তদাতা দিবস উপলক্ষে তার সঙ্গে বলেছে সময়ের আলো।
আলাউদ্দিন সালেহের জন্ম নারায়নগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জে হলেও গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর। পড়াশোনায় স্নাতক সম্পন্ন করেছেন, আবার মাদরাসা থেকে কামিল (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে ৩৩ বছর বয়সী এই যুবক ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসা নিয়ে। একই সঙ্গে রক্তদানের মতো মহৎ কাজ নিয়ে তার পথচলা।
প্রথমবার রক্ত দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে সালেহ বলেন, ‘সবসময়ই আমি রক্তদান করার চেষ্টা করি। সাধারণত প্রতি ৩ মাস পরপরই রক্ত দেই। প্রথমবার রক্তদানের অভিজ্ঞতা খুবই ভীতিকর ছিল। ক্যান্সারে আক্রান্ত একটা ছেলের রক্ত প্রয়োজন হলো। সে সময় কিছুটা হ্যাংলা ছিলাম। আশপাশের অনেকে ভয় দেখিয়েছে। উৎসাহ দেওয়ার বদলে নিরুৎসাহিত করেছে। তাই কিছুটা দ্বিধা কাজ করেছিল। তারপর সাহস করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। মানুষের জীবনটাই আসল। আমি যদি ভয় কাটিয়ে রক্ত দিতে পারি, কারও জীবন বাঁচাতে সহযোগিতা করি, তাহলে ভয়টা আনন্দ ও তৃপ্তিতে রূপ নেয়।’
রক্তদানের পেছনে যেমন কিছু মানুষ তাকে নিরুৎসাহিত করেছে, তেমনই কেউ কেউ তার জন্য ছিল অনুপ্রেরণাও। সালেহ বলেন, ‘মানবিক দায়িত্ববোধ ও অন্যদের অনুপ্রেরণা থেকেই মূলত রক্ত দেওয়ার সাহস পাই। কিছু সিনিয়র ভাইয়েরা, যারা আগে থেকেই রক্তদান করতেন, তারা আমাকে উৎসাহ দিলেন, সাহস দিলেন। তারপর ভয় কাটিয়ে রক্ত দিয়ে ফেললাম।’
জানতে চাইলাম, নিয়মিত রক্তদাতা হিসেবে কোনো স্মরণীয় ঘটনা আছে কী না? তিনি আনন্দ নিয়ে বললেন, ‘রক্তদানের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ মেলে। নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। এ ব্যপারটা ভালোলাগে। যখন কোনো মানুষকে রক্ত দেই, তখন সে মানুষটাকে আমার ওসিলায় আল্লাহ বাঁচিয়ে তোলেন। সেই বেঁচে ওঠা মানুষের হাসি ও ভালোবাসাটাই আসলে বড় অর্জন। মানুষের ভালোবাসার চেয়ে দামি অর্জন পৃথিবীতে আর কী হতে পারে? অনেক অসহায় পরিবার আছে, যারা রক্ত কিনতে পারেন না। তাদের রক্ত দেওয়া, কোনো বিনিময় না নেওয়াটা রীতিমতো তাদের খুশির কারণ। দ্বিতীয়বার যাকে রক্ত দিয়েছিলাম, তিনি এখনও যোগাযোগ রেখেছেন। তার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই দেখা হয়। খুব আন্তরিকতা দেখান, আতিথেয়তা করেন দেখা হলে। এমন আরও অনেক অভিজ্ঞতা আছে।’

রক্তদান করা যে কত জরুরি ও মহৎ কাজ, তা আমরা অনেকেই হয়ত বুঝি না। এ বিষয়ে সালেহ বলেন, ‘যখন একজন মানুষ মৃত্যুশয্যায় চলে যায়, রক্ত না দিলে জীবন বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন তাকে বাঁচানোর ওসিলায় রক্তদান করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে এটা অনুভব করতে পারবে, তার এক ব্যাগ রক্ত একজন মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে পারে, সেই ব্যক্তি নিশ্চয়ই রক্ত দিবে।’
আমাদের সমাজে এই আধুনিক যুগেও রক্ত দেওয়া নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত। তার কাছে জানতে চাইলাম, এসব ভুল ধারণা কীভাবে দূর করা যায়?
উত্তরে সালেহ বলেন, ‘কেউ কেউ মনে করেন, শরীর হ্যাংলা, বেশি লম্বা কিংবা খাটো হলে রক্ত দেওয়া যায় না। ধূমপায়ীদের রক্ত নেওয়া যায় না, রক্ত দিলে শরীরের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয় ইত্যাদি। এক্ষেত্রে আমি বলবো, ক্রস ম্যাচিং শেষে যখন মনে হবে রক্ত নেওয়ার উপযুক্ত, তখনই ডাক্তার রক্ত নেবেন। এ ছাড়া নেবেন না। প্রত্যেকটা মানুষের উচিত, রক্ত দেওয়া নিয়ে সমাজে যেসব ভুল ধারণা প্রচলিত, তা থেকে বেরিয়ে আসা, হাসপাতালে যাওয়া।’
তরুণদের মধ্যে রক্তদানের আগ্রহ তৈরি করার জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে? এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ তরুণ-তরুণী সিরিঞ্জ খুব ভয় পায়। আমার অভিজ্ঞতা থেকে অনেককে দেখেছি, তাদের কোনো সমস্যা নেই, কেবল সিরিঞ্জটাকে ভয় পায়। তাদের উদ্দেশ্যে বলব, রক্ত দেওয়ার সময় পিঁপড়া কামড় দেওয়ার মতো একটু ব্যথা লাগে শুধু। অনেকে ভাবেন, যখন নেওয়া হয়, তখন আমাদের কষ্ট হয়। এ ধারণাটা একদমই ভুল। তাছাড়া, রক্ত দিলে শরীরে নতুন রক্ত আসে। নতুন রক্ত শরীরের জন্য উপকারী। এতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। রক্ত দেওয়াতে আসলে কোনো ক্ষতি নেই।’
রক্তদানের আগে রক্তদাতার কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি। সালেহ বলেন, ‘রক্তদানের আগে যথেষ্ট পরিমাণ ঘুম, পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত পানি খাওয়া জরুরি। অনেক সময় আমি পানি না খেয়েই রক্ত দিতে গেছি। রক্ত দেওয়ার পর আমার মাথা ঝিমঝিম করেছে, শরীর দুর্বল লেগেছে। রক্তদানের দিন ফাস্টফুড জাতীয় খাবার থেকে বিরত থেকে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া ভালো। রক্তদানের পরেও ঠিকঠাক খেতে হবে, বিশেষ করে ডাব খাওয়া উচিত। এ ছাড়া তরল জাতীয় অন্যান্য খাবারও একটু বেশি করে খেতে হবে।’
রক্তদান সালেহর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একবার মুগদা হাসপাতালে রক্ত দিয়েছি। তখন ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বলেন, আপনার রক্ত না হলে রোগীকে আমরা বাঁচাতে পারতাম না। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মানুষকে বাঁচাতে পারার ওই মুহূর্তটাই। এ ছাড়া রক্তদানের মাধ্যমে আমার মধ্যে সততা, মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করার গুণগুলো বৃদ্ধি পেয়েছে।’
রক্তদানের কিছু নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও জানান সালেহ। বলেন, ‘অনেক সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ক্রস ম্যাচ করার আগেই রক্ত নিয়ে নেয়। তারা রক্তগুলো সংগ্রহে রাখেন। রোগীর রক্ত না লাগা স্বত্বেও রক্ত নেন। সে রক্তগুলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিক্রি করে দেয়। হাসপাতালগুলোর উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনারা আগে ক্রস ম্যাচ করান। তারপর যদি রোগীর প্রয়োজন হয়, তবেই রক্ত নিন। আমরা যারা রক্ত দেই, সেই রক্ত রোগীর কাছে না গিয়ে দালালদের কাছে চলে যাওয়াটা খুব দুঃখজনক। আরেকটা কথা হলো, রোগীর স্বজনদের নিয়ে। তারা রক্তদাতাকে অনেক সম্মান করেন। কিন্তু কখনও কখনও নেতিবাচক ঘটনাও ঘটে। আমরা রক্তদাতারা কারও কাছে সাহায্য চাই না। কেউ দিতে চাইলেও নিই না। কারণ, এক ফোঁটা রক্ত কখনোই টাকার সমপরিমাণ হবে না, তা আমরা বিশ্বাস করি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, আমাদেরকে শুধু সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়া হোক। অনেক সময় অসচ্ছল মানুষরা রক্ত দিতে যায়। তাদের যাতায়াত ভাড়াটাও দেওয়া হয় না। অনেককে ন্যূনতম শ্রদ্ধাটুকুও করা হয় না। একজন মানুষ হয়ত অফিস থেকে ছুটি নিয়ে রক্ত দিতে যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসপাতালে বসে থাকে রক্ত দেওয়ার জন্য। কিন্তু রক্তদানের পর মানুষটা ঠিকমতো পৌঁছাতে পারলো কী না, সুস্থ আছে কী না, সেই খোঁজটুকুও নেন না। জানি, তারা রোগী নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু, রক্তদাতাকে একটু পানি খাওয়ানো বা তার ন্যূনতম খেয়াল রাখা উচিত। কেউ কেউ আবার এর থেকেও বেশি করেন। অনেক খাবার খাওয়াতে চান, টাকা দিতে চান। এতটাও আসলে দরকার নেই।’
রক্তদান নিয়ে সালেহ জানালেন তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও। তার স্বপ্ন, রক্তদানে প্রতিটি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তুলতে চান তিনি। স্বপ্ন দেখেন ওয়েবসাইট খোলার, যেখানে দেশের প্রতিটা থানার রক্তদাতাদের তথ্য আপডেট হতে থাকবে। কোন রক্তদাতার ৩ মাস হয়েছে, কাদের হয়নি, এমন নোটিশ থাকবে। যাদের রক্ত প্রয়োজন, তারা যেন সেখান থেকে তথ্য জেনে রক্তদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। সবশেষে জানতে চাইলাম, এ দিনটা নিয়ে আপনার বক্তব্য কী? মানবসেবায় নিয়োজিত আলাউদ্দিন সালেহ বলেন, ‘সব সুস্থ মানুষকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানাই। পৃথিবীটা তখনই সুন্দর হবে, যখন একজন মানুষকে বাঁচাতে আরেকজন এগিয়ে আসবে।’
/মহু