অন্ধ্রপ্রদেশের মাইকা খনিতে হারিয়ে যাওয়া শৈশব

বন্যা নাসরিন

ফিচার

দূর থেকে পাহাড়গুলোকে দেখে মনে হয় যেন রোদের আলোয় মাটি ঝলমল করছে। দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের নেল্লোর অঞ্চলে এমন দৃশ্য অস্বাভাবিক

2026-06-12T14:53:50+00:00
2026-06-12T14:53:50+00:00
 
  শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬,
২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
ফিচার
অন্ধ্রপ্রদেশের মাইকা খনিতে হারিয়ে যাওয়া শৈশব
বন্যা নাসরিন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ২:৫৩ পিএম   (ভিজিট : ১০)
মাইকা খনিতে শ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মৃত্যুও। গ্রাফিক : সময়ের আলো
দূর থেকে পাহাড়গুলোকে দেখে মনে হয় যেন রোদের আলোয় মাটি ঝলমল করছে। দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের নেল্লোর অঞ্চলে এমন দৃশ্য অস্বাভাবিক নয়। এই ঝলমলে আলোর উৎস মাইকা- এক ধরনের খনিজ, যা প্রসাধনী, গাড়ির রং, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে অসংখ্য শিল্পপণ্যে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বের নানা প্রান্তে কোনো তরুণী যখন চোখে চকচকে আইশ্যাডো লাগান, কিংবা কোনো নতুন গাড়ির গায়ে সূর্যের আলো ঝিকমিক করে ওঠে, তখন খুব কম মানুষই জানেন সেই উজ্জ্বলতার পেছনে লুকিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার খনি অঞ্চলের এক নির্মম বাস্তবতা।

অন্ধ্রপ্রদেশের মাইকা শিল্পের ইতিহাস দীর্ঘ। বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই খনিজ উত্তোলনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু এই ইতিহাসের আরেকটি অন্ধকার অধ্যায় হলো শিশুশ্রম। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, ভারতের বিভিন্ন মাইকা উৎপাদন অঞ্চলের মতো অন্ধ্রপ্রদেশেও বহু বছর ধরে শিশুরা খনির শ্রমব্যবস্থার অংশ হয়ে আছে। কোথাও তারা খনির ভেতরে, কোথাও খনির বাইরে মাটি ছেঁকে মাইকার টুকরো আলাদা করে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বয়স মাত্র পাঁচ বা ছয় বছর। ভোর হওয়ার আগেই শুরু হয় তাদের দিন। যখন শহরের শিশুরা ঘুমিয়ে থাকে, তখন খনি এলাকার শিশুরা বাবা-মায়ের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে। কারও হাতে ছোট হাতুড়ি, কারও হাতে বাঁশের ঝুড়ি। স্কুলে যাওয়ার বয়সে তারা শেখে কীভাবে পাথরের স্তূপ থেকে মাইকার পাতলা স্তর আলাদা করতে হয়। তাদের হাত ছোট বলে সূক্ষ্ম টুকরো বাছাই করা সহজ হয়। আর এই কারণেই অনেক নিয়োগকারী বা মধ্যস্বত্বভোগী শিশুদের কাজে লাগাতে আগ্রহী। 

খনির ভেতরের পরিবেশ ভয়াবহ। গরমে দম বন্ধ হয়ে আসে। বাতাসে ধুলোর ঘন স্তর। অনেক সময় খনির দেয়াল এতটাই দুর্বল থাকে যে, সামান্য কম্পনেই ধসে পড়তে পারে। শিশুরা প্রায়ই খালি হাতে বা ন্যূনতম সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করে। তাদের শরীরে থাকে না কোনো সুরক্ষা পোশাক, চোখে থাকে না চশমা, মাথায় থাকে না হেলমেট। কাজ করতে করতে হাত কেটে যায়, পা ফেটে যায়, ধুলাবালিতে শ্বাসকষ্ট হয়। কিন্তু এসব যেন তাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে গেছে।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই শ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মৃত্যুও। ২০১৬ সালে থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের বিভিন্ন মাইকা উৎপাদন অঞ্চলে কয়েক মাসের মধ্যেই একাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটেছিল খনি ধসে। অনুসন্ধানকারীরা অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে এসব মৃত্যুর খবর গোপন রাখা হয়। স্থানীয়ভাবে পরিবারগুলোকে চুপ থাকতে চাপ দেওয়া হয়। কারণ দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ পেলে অবৈধ খনি পরিচালনাকারীদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রতিবেদনে এই খনিগুলোকে 'ঘোস্ট মাইন' বা 'ভূতুড়ে খনি' হিসেবে বর্ণনা করা হয়- যেগুলো সরকারি নথিতে নেই, কিন্তু বাস্তবে সেখানে প্রতিদিন মানুষ কাজ করছে। 

অন্ধ্রপ্রদেশের নেল্লোর অঞ্চলের একটি গ্রামের কাহিনি রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে আসে, যেখানে খনিশ্রমিকদের জীবন খনিজের মতোই কঠিন। স্থানীয়রা জানান, বহু পরিবারে শিশুরা কাজ শুরু করে খুব অল্প বয়সে। কারণ তাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা থাকে না। গ্রামের স্কুল অনেক দূরে, পরিবহন ব্যবস্থা দুর্বল, আর পরিবারের আয় এত কম যে সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর চেয়ে কাজে পাঠানোই অধিক বাস্তব সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়। 

দারিদ্র্য এখানে শিশুদের ভাগ্য নির্ধারণ করে। কোনো পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হলে, ঋণের বোঝা বাড়লে বা ফসল নষ্ট হলে প্রথম আঘাতটি পড়ে শিশুদের ওপর। তখন স্কুল ছাড়তে হয়, বই-খাতা গুছিয়ে রাখতে হয়, নেমে যেতে হয় শ্রমের জগতে। শিশুরা জানেও না, তারা কী হারাচ্ছে। তাদের কাছে জীবন মানেই কাজ, কাজ মানেই বেঁচে থাকা।

মাইকা খনিগুলোর চারপাশে গড়ে ওঠা বসতিগুলোতে গেলে দেখা যায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। মাটির ঘর, অনিরাপদ পানির উৎস, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি- সবকিছুর মাঝেও মাটির ওপর ছড়িয়ে আছে ঝকঝকে মাইকার কণা। যেন প্রকৃতি নিজেই বিদ্রূপ করছে। যে খনিজ আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান, সেই খনিজের উৎসে বসবাসকারী মানুষগুলোই সবচেয়ে দরিদ্র।

বিশ্বব্যাপী প্রসাধনী শিল্পে মাইকার ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা শিশুশ্রমমুক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। কিন্তু বাস্তবে সরবরাহ শৃঙ্খল এত দীর্ঘ ও জটিল যে খনি থেকে কারখানা হয়ে চূড়ান্ত পণ্য পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নজরদারি করা কঠিন। ফলে খনির নিচের স্তরে থাকা শ্রমিকদের জীবন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। 

পরিস্থিতির কিছু পরিবর্তনের কথাও শোনা যায়। অন্ধ্রপ্রদেশের কিছু লাইসেন্সধারী খনিতে এখন আগের তুলনায় শিশুশ্রম কমেছে বলে স্থানীয় তত্ত্বাবধায়করা জানিয়েছেন। শিক্ষা বিস্তার, সরকারি নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে কিছু এলাকায় শিশুরা স্কুলে ফিরেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে নেল্লোর অঞ্চলের একটি বৈধ খনির তত্ত্বাবধায়ক বলেছেন, আগে পুরো পরিবার খনিতে কাজ করলেও এখন অনেক শিশু বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। 

তবে এই অগ্রগতির গল্প পুরো বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে না। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বৈধ খনির বাইরে অনিয়ন্ত্রিত ও অনানুষ্ঠানিক খনি কার্যক্রম এখনও বড় সমস্যা। যতদিন না দারিদ্র্য কমবে, বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং শিক্ষা সবার নাগালে পৌঁছাবে, ততদিন শিশুশ্রম পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। 

একটি শিশুর জীবনে স্কুল মানে ভবিষ্যতের দরজা। কিন্তু মাইকা খনি অঞ্চলের বহু শিশুর জন্য সেই দরজা খুলে ওঠে না। তারা বড় হওয়ার আগেই শ্রমিক হয়ে যায়। তাদের হাতের রেখায় লেখা থাকে না কোনো স্বপ্নের পেশা; লেখা থাকে দিনের শেষে কত কেজি মাইকা সংগ্রহ করতে পারবে তার হিসাব।

অন্ধ্রপ্রদেশের মাইকা খনির গল্প এক সমাজের বাস্তবতা, যেখানে বৈশ্বিক ভোগের চাহিদা ও স্থানীয় দারিদ্র্যের সংঘর্ষে সবচেয়ে বড় মূল্য চুকায় শিশুরা। পৃথিবীর বাজারে মাইকা যতই ঝলমল করুক, সেই ঝিলমিলের ভেতরে চাপা পড়ে আছে অসংখ্য অদেখা মুখ, অগণিত অসমাপ্ত শৈশব এবং এমন এক বাস্তবতা, যা সভ্য বিশ্বের জন্য গভীর চিন্তার কারণ হওয়া উচিত।

/এসএকে


  বিষয়:   অন্ধ্রপ্রদেশ  মাইকা খনি  শৈশব 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: