সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন-
“চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
সুকান্ত ভট্টাচার্যের এ স্বপ্ন এখনও পূরণ হয়নি। আমরা পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করার বদলে ক্রমশই আরও অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছি তাদের। আমাদের চারপাশে দেখা মেলে অসংখ্য শিশু শ্রমিকের। যে বয়সে তাদের পরিবারের সঙ্গে হেসেখেলে দিন কাটানোর কথা, তখন তারা কাঁধে বয়ে বেড়ায় এক অমানবিক জীবনের দায়ভার। তেমনই এক নিষ্ঠুর জীবনের গল্প জানব আজ, যে গল্পের সঙ্গে আমাদের সবার প্রিয় চকলেটের প্রসঙ্গ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
চকলেট এমন একটি মাজাদার খাদ্য, যা প্রায় সবারই পছন্দের। চকলেটের এমন জনপ্রিয়তার কারণে এখন বিশ্বব্যাপী চকলেট দিবসও পালিত হয়। উপহার হিসেবে কিংবা প্রিয় মানুষের অভিমান ভাঙাতে দেওয়া হয় চকলেট। বিশেষ করে শিশুরা এটি খেতে খুব পছন্দ করে। কিন্তু, সেই চকলেটের আড়ালে আছে শিশুদেরই এক অন্ধকার জগৎ!
বিশ্বজুড়ে বহু ধরনের চকলেট রয়েছে। তার মধ্যে ডার্ক চকলেটের গুণাগুণ অনেক। ডার্ক চকলেটে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, যা রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে আনা, হার্ট ভালো রাখা ও ব্রেইনের জন্যেও এ চকলেট খুবই উপকারী। প্রশ্ন হলো, আমরা ডার্ক চকলেটের ইতিহাস সম্পর্কে কয়জন জানি? ডার্ক শব্দের অর্থ অন্ধকার। নামের আড়ালেই যেন লুকিয়ে আছে রহস্য!
দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই আধুনিক পৃথিবীতে এখনও লাখ লাখ শিশুশ্রমিক রয়েছে। তার মধ্যে আফ্রিকাতেই প্রায় ৬৫-৭০ লাখ শিশুরা শিশুশ্রমের কবলে পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সেসব শিশুশ্রমিকের একটা বড় অংশ কোকো ফার্মের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় কাজ করে। প্রতিবছর কোকোর শতকরা ৭০ ভাগ উৎপাদিত হয় আইভরিকোস্ট ও ঘানায়। সেই কোকো উৎপাদনের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বেশিরভাগই শিশুশ্রমিক। শিশুরা শৈশব-কৈশোর জলাঞ্জলি দিয়ে বছরের পর বছর কাজ করে যাচ্ছে কোকো ফার্মগুলোয়। প্রতিটি শিশু শ্রমিকের আছে একটা নির্যাতিত করুণ জীবন। সেই জীবনের বিনিময়ে আমরা পাচ্ছি সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর ডার্ক চকলেট!
আইভরিকোস্ট ও ঘানার পার্শ্ববর্তী দেশ ও বিভিন্ন অঞ্চল যেমন— বুরকিনা ফাসো, টোগো, নাইজেরিয়া ইত্যাদি পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকার কারণে সেখান থেকে প্রতিনিয়ত পাচার হয়ে আসে হাজার হাজার শিশু। দারিদ্র্যের কারণে নিরুপায় হয়ে অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানকে অল্প কিছু অর্থের বিনিময়ে তুলে দেন দালালদের হাতে। পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়ায় পাচারকারী দল এসব শিশুকে নিয়ে সহজেই পৌঁছে যায় আইভরিকোস্ট ও ঘানার কোকো ফার্মে।
নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হয়ে যাওয়া এসব শিশুর অধিকাংশের বয়স ৯-১৬ বছর। যারা একবার এখানে বিক্রি হয়ে যায়, তারা সাধারণত আর নিজের জন্মভূমিতে মা-বাবার কাছে ফিরে যেতে পারে না। পরিবারের সঙ্গে চিরকালের বিচ্ছেদ হয় তাদের। পালাতে গিয়ে ধরা পড়লে হতে হয় নির্মম নির্যাতনের শিকার। এখানে জীবনের কোনো মূল্য নেই বললেই চলে।
ফার্মের মালিকরা তাদের দিয়ে অমানবিক পরিশ্রম করান। একটি শিশু সর্বোচ্চ যত পরিশ্রম করতে পারে, তাদের দিয়ে ততটাই পরিশ্রম করানো হয়। ভোর ৬টা থেকে রাত ৯-১০টা পর্যন্ত চলে তাদের বিরামহীন কাজ। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, এত পরিশ্রমের বিনিময়ে তারা কিছুই পায় না। তাদের ঠিকমতো খেতেও দেওয়া হয় না। অমানবিক পরিশ্রমের কারণে স্বাভাবিকভাবেই তাদের খুব ক্ষুধা পায় এবং শরীরের অনেক পুষ্টির দরকার হয়। কিন্তু বেশি ক্ষুধা পেলে তাদের খেতে দেওয়া হয় ভুট্টা সেদ্ধ বা কলা। এসব একঘেয়ে খাবার খেয়ে তাদের বেঁচে থাকতে হয়।
তারা যে ডার্ক চকলেট তৈরির পেছনে এই অমানবিক পরিশ্রম করছে, সেই চকলেট খেতে কেমন- সেসব শিশুদের অনেকেই তা জানে না। ক্লান্তিতে অবসন্ন শরীর নিয়ে তারা ঠিকমতো ঘুমানোর সুযোগও পায় না। তাদের ঘুমাতে হয় দরজা-জানালাবিহীন বদ্ধ ঘরে।
কোকো পাড়া হয়ে গেলে তা বস্তায় ভরা হয় এবং সেই ভারী বস্তা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বহন করে নিয়ে আসতে হয় তাদের। এসব বস্তা শিশুর চেয়েও বড় হয় এবং ওজনও হয় অনেক বেশি। জঙ্গলের দুর্গম পথ দিয়ে বস্তা নিয়ে দ্রুত না হাঁটলে, তাদের আঘাত করা হয়। এমনকি ক্লান্তি পেলে একটু বিশ্রাম নিতে গেলেও চাবুকের আঘাতে জর্জরিত করা হয়। শারীরিকভাবে নির্যাতিত হওয়াটাই যেন তাদের প্রতিদিনের জীবন।
কাজ করার সময় এসব শিশুশ্রমিক দুটি দলে ভাগ হয়ে যায়। এক দল চাপাতি দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে, অন্য দল কোকো পাড়ে। এসব চাপাতি এত ধারাল যে, তা অনায়াসে একজন মানুষকে হত্যা করতে পারে। তাই কাজ করার সময় অনেক শিশু আহত হয়। এখানে এমন কোনো শিশু নেই, যার শরীরে চাপাতির আঘাতের দাগ নেই। এত আঘাত পেতে পেতে এবং এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে প্রায় সব শিশুই চর্মরোগের শিকার হয়। তাদের ঠিকঠাক চিকিৎসাও মেলে না।
শিশুশ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৪০ ভাগ মেয়ে। খুব অল্প বয়সেই তারা বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়, অনেকেই গর্ভবতী হয়ে পড়ে। নানাবিধ যৌনরোগেও আক্রান্ত হয়। এমনকি কোনওপ্রকার নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই কোকো ফিল্ডে শিশুদের দিয়ে বিষাক্ত কীটনাশক স্প্রে করানো হয়। ফলে কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে, চোখের ক্ষতি হয়, অনেক সময় অন্ধও হয়ে যায়। এই প্রতিকূল জীবন সহ্য করতে না পেরে অনেক শিশুই মারা যায়। মৃত্যুর পরও তাদের যথাযথ দাফন করা হয় না। মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় কোনো নর্দমা বা খালে, কখনও তা ছিঁড়ে খায় বন্য পশু।
এই আধুনিক যুগে এসেও বিশ্বের কোথাও কোথাও যে এমন বর্বর ক্রীতদাসের জীবনযাপন করে অসংখ্য মানুষ, তা একইসঙ্গে বিস্ময়কর এবং ভীষণ লজ্জার। শিশুদের এই অমানবিক জীবন থেকে বাঁচানোর জন্য বারবার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেসব পদক্ষেপ বা চুক্তি কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
এই বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে অনেককে জীবনও দিতে হয়েছে। ২০০৪ সালে আইভরিকোস্টের এক সাংবাদিককে এ ঘটনায় হত্যা করা হয়। এমনকি ২০১০ সালে আইভরিকোস্ট সরকার তিনটি সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে দেয় এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার কারণে।
কিছুটা আশার আলো এই যে, ‘ইন্টারন্যাশনাল কোকোয়া ইনিশিয়েটিভ ‘ শিশুশ্রম বন্ধে কাজ করছে। শিশুরা এই বর্বর জীবন থেকে মুক্তি পাক। তারা ফিরে পাক প্রকৃত শৈশব ও কৈশোর। কাঁধে ভারী কোকোর বস্তার বদলে স্কুলব্যাগ নিয়ে বিদ্যালয়ে যাক- এটাই সবার প্রত্যাশা।
/এসএকে