তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে আসলেই নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ে?

বন্যা নাসরিন

ফিচার

মনে করুন, গ্রীষ্মের এক তপ্ত দুপুর। কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছেন আপনি, একইসঙ্গে আপনার পুরুষ সঙ্গীটিও। তীব্র গরমে মেজাজ নিয়ন্ত্রণ

2026-06-13T20:54:14+00:00
2026-06-13T21:28:53+00:00
 
  শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
ফিচার
তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে আসলেই নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ে?
বন্যা নাসরিন
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৮:৫৪ পিএম  আপডেট: ১৩.০৬.২০২৬ ৯:২৮ পিএম  (ভিজিট : ৬)
গ্রীষ্মের এই দাবদাহ ক্রমশ সামাজিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। গ্রাফিক : সময়ের আলো
মনে করুন, গ্রীষ্মের এক তপ্ত দুপুর। কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছেন আপনি, একইসঙ্গে আপনার পুরুষ সঙ্গীটিও। তীব্র গরমে মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তিনি আপনার কিংবা আপনার শিশুটির গায়ে হাত তুলে ফেললেন, শুনিয়ে দিলেন কিছু কটু কথা। এমন পরিস্থিতি নিশ্চয়ই কাম্য নয়? কিন্তু গ্রীষ্মের এই দাবদাহ ক্রমশ সামাজিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার একটি উদ্বেগজনক সম্পর্ক রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে, দীর্ঘ হচ্ছে তাপপ্রবাহের সময়কাল, বাড়ছে খরা, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই বলছেন, এর প্রভাব শুধু পরিবেশ বা অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের আচরণ, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক নিরাপত্তার ওপরও এর গভীর প্রভাব পড়ে। গার্হস্থ্য সহিংসতা, যৌন সহিংসতা, বাল্যবিবাহ এবং শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনাও অনেক ক্ষেত্রে জলবায়ুগত চাপের সময় বেড়ে যায়।

প্রশ্ন হলো, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সহিংসতার সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হয়? এর উত্তর খোঁজা যাক।


মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ক নির্দিষ্ট তাপমাত্রার মধ্যে সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে কাজ করে। তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে গেলে শরীরে অস্বস্তি, ক্লান্তি, পানিশূন্যতা এবং ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। একইসঙ্গে বাড়ে বিরক্তি, উত্তেজনা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা। ২০২৩ সালে 'জ্যামা সাইকিয়াট্রি' জার্নালে প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে সঙ্গীর প্রতি সহিংসতা প্রায় ৪.৪৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সেই গবেষণায় দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ- ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে গবেষকেরা দেখেছেন, তাপমাত্রা বেশি থাকলে শারীরিক ও যৌন সহিংসতার হার আরও বেশি বাড়ে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার সময় শারীরিক সহিংসতা প্রায় ৮ শতাংশ এবং যৌন সহিংসতা ৭.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালে 'এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পার্সপেক্টিভস'-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে সাধারণত সহিংসতার ঝুঁকি ৯ শতাংশ বেড়ে যায়। ১৬ হাজারেরও বেশি গবেষণাপত্র যাচাই করে বাছাই করা ৮৩টি গবেষণা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই ফলাফল পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পুলিশ-এর ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সংগৃহীত অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রীষ্মের মাসগুলোতে (বিশেষ করে মার্চ থেকে জুন মাসে) নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কোনো কোনো বছর মার্চ থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে নির্যাতনের হার প্রায় ৩৫.৪% পর্যন্ত বেড়ে যায়।

মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে ‘Heat-Aggression Theory’ বা তাপ-আগ্রাসন সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছেন। এই ধারণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরম মানুষের মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণের প্রবণতা বাড়াতে পারে। যখন মানুষ শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যে থাকে, তখন ছোটখাটো বিরোধও বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। পরিবারের ভেতরে এই উত্তেজনার সবচেয়ে বড় শিকার হন নারী ও শিশুরা, কারণ অনেক সমাজে তারা তুলনামূলকভাবে কম ক্ষমতাবান এবং আত্মরক্ষার সুযোগও কম।


তাপমাত্রা বৃদ্ধি কেবল মানুষের মেজাজে প্রভাব ফেলে না, এটি জীবিকা ও অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের মতো দেশে কৃষি, মৎস্য, দিনমজুরি এবং আরও বিভিন্ন খাতের বিপুলসংখ্যক মানুষ সরাসরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ খরা, অতিবৃষ্টি কিংবা তাপপ্রবাহের কারণে আয় কমে গেলে পরিবারে আর্থিক চাপ তৈরি হয়। এই চাপ অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহ বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বেকারত্ব গার্হস্থ্য সহিংসতার গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। যখন পরিবারের উপার্জন কমে যায়, ঋণ বাড়ে বা খাদ্যসংকট দেখা দেয়, তখন পরিবারে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং নারী ও শিশুরা সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা নদীভাঙনের মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগের পর অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র বা অস্থায়ী ক্যাম্পে থাকতে বাধ্য হন। এসব জায়গায় সাধারণত ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কম থাকে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয় এবং নারী ও শিশুর জন্য আলাদা সুরক্ষা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত থাকে না। ফলে যৌন হয়রানি, নির্যাতন এবং শোষণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাস্তুচ্যুতি ও সামাজিক অস্থিরতার সময় নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা বাড়তে পারে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের একটি কম আলোচিত প্রভাব হলো বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি। যখন কোনো পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে, তখন মেয়ের বিয়ে দিয়ে পরিবারের ব্যয় কমানোর প্রবণতা দেখা দিতে পারে। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এমন প্রবণতা আরও বেশি দেখা যায়। এটি মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। 


জলবায়ুগত সংকট শিশুদের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। বিদ্যালয় বন্ধ হওয়া, বাসস্থান হারানো, খাদ্যসংকট, পারিবারিক অস্থিরতা- সবকিছু মিলিয়ে শিশুদের মানসিক চাপ বেড়ে যায়। অনেক শিশু বাধ্য হয় শ্রমে যুক্ত হতে। কেউ কেউ স্কুল ছেড়ে দেয়। যেসব পরিবারে অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ বাড়ে, সেখানে শিশু নির্যাতন, শারীরিক শাস্তি এবং অবহেলার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু আইনি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার মধ্যেই নারী ও শিশু সুরক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর মধ্যে থাকতে পারে দুর্যোগকেন্দ্রে নিরাপদ ও পৃথক স্যানিটেশন ব্যবস্থা, নারী ও শিশুবান্ধব আশ্রয়কেন্দ্র, দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিশেষ নজরদারি, জলবায়ু বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা ইত্যাদি।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পরিবেশ রক্ষার লড়াই নয়। এটি নিরাপদ পরিবার, সহিংসতামুক্ত সমাজ এবং মানবাধিকারের সুরক্ষার লড়াইও। এ ব্যপারে সচেতন হওয়া এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া খুব জরুরি।

/মহু



  বিষয়:   তাপমাত্রা  নারী  শিশু  সহিংসতা  অত্যাচার  নির্যাতন 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: