রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া হলো বাজেট। ছবি : সময়ের আলো জাতীয় বাজেট শুধু রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে বাজেট একটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং নীতিগত অগ্রাধিকারের বার্ষিক প্রতিফলন। চলুন জেনে নিই, বাংলাদেশে এই বাজেট কীভাবে পেয়েছিল আইনি ভিত্তি।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বিভিন্ন সময়ে বাজেটকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তব রূপরেখা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। টানা ১২ বার জাতীয় বাজেট উপস্থাপনকারী এই প্রবীণ অর্থমন্ত্রীই ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৯’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বর্তমানে এই আইন বাজেট প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান আইনগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। আইনটির ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো অর্থবছরে প্রয়োজন দেখা দিলে অর্থমন্ত্রী সংশোধিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করতে পারেন।
আবুল মাল আব্দুল মুহিত প্রায়ই বলতেন, বাজেটের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব যতটা, তার আইনগত ভিত্তিও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আইনের অনুমোদন ছাড়া সরকার যেমন জনগণের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতে পারে না, তেমনি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেও অর্থ ব্যয় করতে পারে না।
বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদনের মূল ভিত্তি হলো সংবিধান। সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, কর আরোপ, সরকারি ব্যয় এবং সংসদের ভূমিকা সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ কারণেই জাতীয় বাজেটকে কেবল একটি অর্থনৈতিক দলিল নয়, বরং একটি সাংবিধানিক দলিল হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
জাতীয় বাজেটের কেন্দ্রবিন্দু হলো সংসদ। প্রতি অর্থবছরের আগে অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এতে সরকার আগামী অর্থবছরে কত রাজস্ব আদায় করবে, কোন খাতে কত ব্যয় করবে এবং কী ধরনের করনীতি অনুসরণ করবে- তার বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। তবে বাজেট সংসদে উপস্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়ে যায় না। সংসদের অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় আইন পাস হওয়ার পরই বাজেট কার্যকর হয়।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের সব আয় প্রথমে জমা হয় সংযুক্ত তহবিলে। এই তহবিল থেকে অর্থ ব্যয়ের জন্য সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এজন্য বাজেট আলোচনার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ‘অনুদানের দাবি’ অনুমোদন করা হয়। এরপর ‘বিনিয়োগ আইন’ পাসের মাধ্যমে সেই অর্থ ব্যয়ের আইনগত অনুমতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ, সংসদের অনুমোদন ছাড়া সরকারি ব্যয় সাংবিধানিকভাবে বৈধ নয়।
একইভাবে বাজেটে নতুন কর আরোপ, করের হার বৃদ্ধি বা কর কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হলে অর্থ বিল পাস করতে হয়। এই বিলের মাধ্যমেই করসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো আইনগত রূপ পায়। ফলে বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কোনো কর কার্যকর হয় না; কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজন সংসদীয় অনুমোদন।
আবুল মাল আব্দুল মুহিত তার দীর্ঘ অর্থমন্ত্রিত্বকালে বারবার উল্লেখ করেছেন, আধুনিক বাজেট ব্যবস্থার মূল শক্তি হলো জবাবদিহি ও বৈধতা। তার মতে, বাজেটের প্রতিটি টাকা জনগণের অর্থ এবং সেই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে জনগণের প্রতিনিধিদের সম্মতি থাকা আবশ্যক। এই দর্শনের কারণেই সংসদীয় অনুমোদনকে বাজেট প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে দেখা হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের অর্থ ব্যয়ের ওপর সংসদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই বাজেট ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
বাজেট অনুমোদনের মধ্যেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও একাধিক আইন, বিধিমালা ও প্রশাসনিক নির্দেশনা কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ, নিরীক্ষা এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে সুসংগঠিত আর্থিক কাঠামো। এ ক্ষেত্রে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকারি ব্যয় নিরীক্ষার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠান আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
কখনও কখনও নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ বাজেট অনুমোদন সম্ভব নাও হতে পারে। এমন পরিস্থিতির জন্য সংবিধানে ‘ভোট অন অ্যাকাউন্ট’ বা অন্তর্বর্তী অর্থ অনুমোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমিত সময়ের জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যয় পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে এই ক্ষেত্রেও সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক, যা বাজেট প্রক্রিয়ায় আইনসভার কেন্দ্রীয় ভূমিকারই প্রতিফলন।
রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শক্তিশালী আইনগত ভিত্তির বিকল্প নেই। কর আদায় থেকে শুরু করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হলো জাতীয় বাজেট। তাই জাতীয় বাজেটকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একদিকে যেমন সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রতিফলন, অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় সাংবিধানিক বৈধতা, গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং জনজবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি মৌলিক উপকরণ।
/মহু