জাতীয় বাজেট। শব্দ দুটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সংসদের অধিবেশন, অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘ বক্তৃতা, টেলিভিশনের বিশেষ আলোচনা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্কের ঝড়। কে কত কর দেবে, কোন খাতে কত বরাদ্দ বাড়ল, কোথায় কমল- এসব নিয়েই সাধারণত বাজেটকে ঘিরে জনআগ্রহ তৈরি হয়।
কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, ‘বাজেট’ ধারণাটির শুরু কোথায়? কীভাবে রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরার এই প্রথা চালু হলো? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আঠারো শতকের শেষভাগে, ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অস্থির সময়ে। সেখানে দেখা মিলবে এক তরুণ রাষ্ট্রনায়কের, যিনি শুধু নিজের সময়ের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেননি, বরং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিও নির্মাণ করেছিলেন। তার নাম উইলিয়াম পিট দ্য ইয়াংগার।
১৭৮৩ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হন উইলিয়াম পিট দ্য ইয়াংগার। ইতিহাসের অন্যতম কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া এই তরুণ রাজনীতিক এমন এক সময়ে দেশের নেতৃত্বে আসেন, যখন ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক চাপ দ্রুত বাড়ছিল।
ফরাসি বিপ্লবের অভিঘাত তখন পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে। পরে নেপোলিয়নের উত্থান সেই অস্থিরতাকে আরও তীব্র করে তোলে। ব্রিটেনকে সামরিক প্রস্তুতি বাড়াতে হয়, যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে অভূতপূর্ব মাত্রায়। এমন বাস্তবতায় সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন ছিল- এই বিপুল ব্যয়ের অর্থ আসবে কোথা থেকে? তখন প্রয়োজন দেখা দেয় এমন একটি ব্যবস্থার, যেখানে সরকার স্পষ্টভাবে জানাবে- কোথা থেকে অর্থ আসবে এবং কোথায় তা ব্যয় করা হবে। তখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জন্ম নেয় আধুনিক বাজেট ব্যবস্থার ধারণা।
এই প্রেক্ষাপটে উইলিয়াম পিট ১৭৯৯ সালে সংসদে আয়কর চালুর প্রস্তাব দেন। আজকের দিনে আয়কর খুবই পরিচিত বিষয় হলেও সে সময় এটি ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রথমবারের মতো তুলনামূলক উচ্চ আয়ের নাগরিকদের ওপর সরাসরি কর আরোপ করা হয়। এর মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোয় একটি নতুন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়- ‘রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নাগরিকেরও অংশগ্রহণ রয়েছে।’ পিটের এই উদ্যোগ কেবল অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তন করেনি; এটি রাষ্ট্র, নাগরিক এবং প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনের সম্পর্ককেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল।
‘বাজেট’ শব্দটির উৎসও কম চমকপ্রদ নয়। শব্দটি এসেছে ফরাসি Bougette থেকে, যার অর্থ ছোট থলে বা ব্যাগ। ব্রিটিশ সংসদে অর্থমন্ত্রী যখন রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে যেতেন, তখন তিনি প্রয়োজনীয় নথিপত্র একটি চামড়ার ব্যাগে করে নিয়ে আসতেন। ধীরে ধীরে সেই ব্যাগের নামই নথিপত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। পরে রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয়ের পুরো পরিকল্পনাকেই বলা শুরু হয় ‘বাজেট’। একটি সাধারণ চামড়ার ব্যাগের নাম যে একদিন বিশ্বের প্রায় সব দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার পরিচিত শব্দ হয়ে উঠবে, তা হয়ত তখন কেউ কল্পনাও করেনি।
অবশ্য রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখার ইতিহাস বাজেটের চেয়েও অনেক পুরোনো। প্রাচীন মিশর, রোমান সাম্রাজ্য, চীন কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশ- সব সভ্যতাতেই কর আদায় ও ব্যয়ের নথিপত্র সংরক্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। শাসকেরা রাজস্ব সংগ্রহ করতেন, সেনাবাহিনী পরিচালনা করতেন, অবকাঠামো নির্মাণ করতেন।
তবে, সেই ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক বাজেটের একটি মৌলিক পার্থক্য ছিল। প্রাচীন যুগে অর্থব্যবস্থা পরিচালিত হতো মূলত রাজা বা সম্রাটের ইচ্ছানুসারে। জনগণের কাছে জবাবদিহিতার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। রাষ্ট্র কত আয় করছে, কত ব্যয় করছে কিংবা অর্থ কোথায় যাচ্ছে- এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগও সীমিত ছিল। ব্রিটেনে যে বাজেট প্রথার সূচনা হয়, তার বিশেষত্ব ছিল অন্য জায়গায়। এখানে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সামনে সরকারের আর্থিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হতো। আলোচনার সুযোগ থাকত, সমালোচনার সুযোগ থাকত এবং সরকারের ওপর জবাবদিহিতার চাপ তৈরি হতো। অর্থাৎ বাজেট শুধু হিসাবের খাতা নয়, এটি গণতান্ত্রিক শাসনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী দলিলে পরিণত হয়েছে। একটি সরকার কোন খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কত বিনিয়োগ করছে, অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষায় কত অর্থ ব্যয় করবে- এসব সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটে বাজেটে। ফলে, বাজেটের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণের রূপরেখা।
বাংলাদেশেও প্রতি বছর জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করা হয়। সাধারণত জুন মাসে ঘোষিত এই বাজেটে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আয়, উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, করনীতি এবং অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরা হয়।
আসলে বাজেট হলো রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক চুক্তি। যেখানে সরকার জানায়, জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে। জনগণ সেই ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকার পায়।
দুই শতাব্দীরও বেশি আগে ব্রিটিশ সংসদে যে প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল, আজ তা বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
/মহু