প্রতিবছরের মতো আজ ২৯ জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব লিপস্টিক দিবস। সৌন্দর্যচর্চা, ফ্যাশন ও প্রসাধনী শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন প্রসাধনী প্রতিষ্ঠান নতুন পণ্য উন্মোচন, বিশেষ মূল্যছাড় এবং নানা প্রচারণার আয়োজন করে থাকে।
বিশ্ব লিপস্টিক দিবস উদযাপনের এই যাত্রা শুরু হয় ২০১৬ সালে। জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হুদা বিউটির প্রতিষ্ঠাতা ও মেকআপশিল্পী হুদা কাত্তান দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচিত করে তোলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল রঙের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা এবং আত্মপ্রকাশকে উৎসাহিত করা।
যেই লিপস্টিক আজ বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত একটি প্রসাধনী, তার ইতিহাস প্রায় ৫ হাজার বছর পুরনো। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার নারীরা মূল্যবান পাথর গুঁড়ো করে ঠোঁট রাঙাতেন। প্রাচীন মিসরে লাল ঠোঁট ছিল সৌন্দর্য ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক, নারী-পুরুষ উভয়েই ঠোঁটে রঙ ব্যবহার করতেন।
লিপস্টিক বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্যচর্চার অন্যতম অপরিহার্য উপকরণ। ছবি : সংগৃহীত
মিশরের বিখ্যাত রানি ক্লিওপেট্রা প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি লাল রঙের ঠোঁটের প্রসাধনী ব্যবহার করতেন বলেও ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। পরে প্রাচীন গ্রিস ও রোমেও ঠোঁট রাঙানোর প্রচলন ছড়িয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে জনপ্রিয়তায় ওঠানামা হলেও শেষ পর্যন্ত লিপস্টিক বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্যচর্চার অন্যতম অপরিহার্য উপকরণে পরিণত হয়।
আধুনিক লিপস্টিকের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয় ১৮৮৪ সালে। প্রথমদিকে এটি কাগজে মোড়ানো অবস্থায় বিক্রি হলেও পরে ধাতব টিউবের আবিষ্কারে ব্যবহার আরও সহজ ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্র, ফ্যাশন ও বিজ্ঞাপনের প্রসারের ফলে লিপস্টিক দ্রুত বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
লিপস্টিক এখন শুধু একটি প্রসাধনী নয়, এটি আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব এবং নিজেকে প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। প্রতিদিন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ তাদের দৈনন্দিন সাজের অংশ হিসেবে লিপস্টিক ব্যবহার করে থাকেন।
লিপস্টিকের ইতিহাস যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেশ কিছু মজার তথ্যও। বিশ্বের সবচেয়ে দামি লিপস্টিকের মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যার বিশেষত্ব ছিল এতে বসানো আসল হীরা।
১৯১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে নারী ভোটাধিকারের আন্দোলনে অংশ নেওয়া বহু নারী লাল লিপস্টিক ব্যবহার করেছিলেন প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল লিপস্টিক উৎপাদন বন্ধ করতে চাননি। তার বিশ্বাস ছিল, এটি মানুষের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল ধরে রাখতে সহায়তা করে।
‘ডেজ অব দ্য ইয়ারের’ তথ্যমতে, একজন নারী সারা জীবনে গড়ে দেড় হাজার ডলারেরও বেশি অর্থ লিপস্টিক কেনার পেছনে ব্যয় করেন।
লাল রঙের লিপস্টিক সবচেয়ে জনপ্রিয়। ছবি : সংগৃহীত
এই প্রসাধনীটি বাজারে অনেক রঙে পাওয়া যায়। তবে, সব শেডের মধ্যে লাল লিপস্টিক এখনো সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। সৌন্দর্যবিশেষজ্ঞদের মতে, লাল রং আত্মবিশ্বাস, শক্তি ও ব্যক্তিত্বের প্রতীক। তবে বর্তমানে গোলাপি, বাদামি, প্রবাল, বেগুনি এবং ত্বকের রঙের সঙ্গে মানানসই বিভিন্ন শেডও সমানভাবে জনপ্রিয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, লিপস্টিক কেনার সময় শুধু রঙ নয়, পণ্যের মান ও উপাদানও যাচাই করা উচিত। ত্বকের সঙ্গে মানানসই শেড বেছে নেওয়া, ঠোঁটের আর্দ্রতা বজায় রাখে এমন পণ্য ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনী এড়িয়ে চলা এবং অন্যের ব্যবহৃত লিপস্টিক ব্যবহার না করাই নিরাপদ। পাশাপাশি দিনের শেষে লিপস্টিক ভালোভাবে পরিষ্কার করে ফেলার অভ্যাসও জরুরি।
বিশ্ব লিপস্টিক দিবস উদযাপনে বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। অনেক দিন ধরে ভাবছেন এমন কোনো নতুন শেড কিনতে পারেন আজই। চাইলে লাল, গোলাপি বা বাদামির পাশাপাশি নীল, বেগুনি কিংবা সবুজের মতো ভিন্ন রঙও একবার ব্যবহার করে দেখতে পারেন। নতুন কিছু না কিনলেও, প্রিয় লিপস্টিক পরে একটি হাসিমুখের সেলফিই হতে পারে আজকের দিনের সবচেয়ে সুন্দর উদযাপন।