বাজেটের সময় এলেই চারদিকে নানা আলোচনা শুরু হয়। হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাব, নতুন কর, ভর্তুকি, ঘাটতি, উন্নয়ন ব্যয় আরও কত কী! কিন্তু সরকার এত টাকা পায় কোথা থেকে, খরচই বা করে কোথায়?
আসলে রাষ্ট্রের অর্থনীতির গল্প শুরু হয় নাগরিকদের থেকেই। আমরা যখন বাজার থেকে কোনো পণ্য কিনি, রেস্টুরেন্টে খাই, মোবাইল ফোনে রিচার্জ করি কিংবা বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণ করি, তখন যে অর্থ পরিশোধ করি তার একটি অংশ কর হিসেবে সরকারের কোষাগারে জমা হয়। বিশেষ করে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর সরকারের আয়ের অন্যতম বড় উৎস। একইভাবে নির্দিষ্ট সীমার বেশি আয় করলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আয়কর দিতে হয়। এসব কর থেকে যে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, তাকে বলা হয় রাজস্ব আয়।
তবে, করই সরকারের একমাত্র আয়ের উৎস নয়। বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির সময় শুল্ক আদায় করা হয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকেও সরকার আয় করে। এ ছাড়া নানা ধরনের ফি, বিদেশি অনুদান এবং দেশি-বিদেশি ঋণ থেকেও অর্থ সংগ্রহ করা হয়। অর্থাৎ সরকারের আয় আসে একাধিক উৎস থেকে, যার সমন্বয়েই পরিচালিত হয় রাষ্ট্রের বিশাল কর্মকাণ্ড।
আয় যেমন আছে, তেমনি রয়েছে ব্যয়ও। সরকারের ব্যয়কে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এক অংশ হলো দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অফিস পরিচালনা, প্রশাসনিক খরচ, বিদ্যুৎ-পানি বিলসহ নানা নিয়মিত ব্যয় এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে এসব ব্যয় অপরিহার্য।
অন্যদিকে রয়েছে উন্নয়ন ব্যয়। একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে মূলত এই খাতের মাধ্যমে। নতুন সড়ক নির্মাণ, সেতু তৈরি, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো উন্নয়ন- এসব কাজের জন্য যে অর্থ ব্যয় করা হয়, তা উন্নয়ন বাজেটের অংশ। প্রতি বছর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করে, সেটিই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি নামে পরিচিত।
তবে, সব সময় সরকারের আয় ও ব্যয় সমান থাকে না। অনেক সময় ব্যয়ের পরিমাণ আয়ের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। তখন তৈরি হয় বাজেট ঘাটতি। এই ঘাটতি পূরণে সরকার দেশীয় ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র কিংবা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে। কখনও কখনও বিদেশি অনুদানও এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বাজেট আলোচনায় প্রায়ই আরেকটি শব্দ শোনা যায়- ভর্তুকি। কোনো পণ্য বা সেবার প্রকৃত মূল্য জনগণের জন্য কমিয়ে রাখতে সরকার যখন নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ যোগ করে, তখন তাকে ভর্তুকি বলা হয়। কৃষকদের জন্য সারের দাম কম রাখা এর একটি পরিচিত উদাহরণ। ভর্তুকির মাধ্যমে সরকার অনেক সময় নির্দিষ্ট খাতকে সহায়তা দেয় এবং জনগণের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানোর চেষ্টা করে।
একইভাবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতও বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক ভূমিকার অন্যতম প্রকাশ ঘটে এই খাতের মাধ্যমে।
বাজেটের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ। যখন একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য বা সেবা কেনা যায়, তখন তাকে মূল্যস্ফীতি বলা হয়। অর্থাৎ, পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। তাই বাজেট প্রণয়নের সময় সরকারকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাবই নয়, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়।
অন্যদিকে, অনেক সময় বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। একে বলা হয় অপর্যাপ্ত বরাদ্দ। এর ফলে সংশ্লিষ্ট খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং পরিকল্পনার বাস্তবায়নও ধীর হয়ে যেতে পারে।
আসলে, সরকারের আয় কোথা থেকে আসবে, সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হবে এবং দেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে- তারই একটি সামগ্রিক রূপরেখা তুলে ধরে জাতীয় বাজেট।
/মহু