বাংলার জনপদ এবং হৃদয়ের এ কূল ও কূল ভাসিয়ে দিয়ে প্রকৃতিতে আষাঢ় আসে। বৃষ্টির জলে লেখা হয় প্রেম কিংবা বিরহ যাপনের অনেক না বলা কথা। সেইসব শব্দমালা গান, কবিতা কিংবা গল্প হয়ে যুগ যুগ ধরে আমাদের হৃদয় জমিনকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। কিছু গানে এমনই নিবিড় দুঃখগাঁথা, অভিমান ও অপেক্ষা জমা থাকে যে, তা আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়ে যায়। সেই গানের সুর, প্রতিটি চরণের ভাবার্থ আমাদের দীর্ঘসময় মোহাচ্ছন্ন করে রাখে, বারবার ভাবিয়ে তোলে। তেমনই একটি গান ‘পুবালী বাতাসে’। গানটি লিখেছেন উকিল মুন্সি এবং কণ্ঠে তুলেছেন বারী সিদ্দিকী।
বাঙালি গৃহবধূদের নাইওর যাত্রা নিয়ে এ মর্মস্পর্শী ভাটিয়ালি ধারার লোকগানের প্রথম চরণেই এসেছে আষাঢ়ের কথা। গানের প্রতিটি পঙক্তি যেন বর্ষার জলে ভেজা। প্রতিটি শব্দের গায়ে লেগে আছে নদীর গন্ধ, কাদামাটির গন্ধ ও এক নারীর গোপন অশ্রু বিসর্জন। আষাঢ়ের পানির সঙ্গে এখানে ভেসে আসে এক বিবাহিত মেয়ের বাপের বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা, যার নাম- নাইওর। নদীমাতৃক বাংলার লোকজীবনে নাইওর শুধু বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা ছিল না, ছিল মেয়েদের বেঁচে থাকা ও ভালো থাকার এক মানসিক আশ্রয়। এই গান সেই আশ্রয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকা এক নারীর দীর্ঘশ্বাস। যেখানে আছে অস্তিত্বসংকট, শেকড়ের প্রতি আকুলতা, নিঃসঙ্গতা এবং হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা বাপের বাড়ির জন্য অবিরাম মন কেমন করা অনুভূতি।
আজকের মতো তখন পাকা রাস্তা ছিল না, সেতু ছিল না, মোটরযানও ছিল সীমিত। বর্ষা এলেই নদী-নালা-খাল-বিল একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেত। যে গ্রামে পৌঁছাতে শুষ্ক মৌসুমে দিনের পর দিন লাগত, বর্ষায় সেখানে নৌকায় সহজেই যাওয়া যেত। তাই আষাঢ় ছিল যোগাযোগের ঋতু। একইসঙ্গে মেয়েদের জন্য নাইওরের ঋতু।
আষাঢ়ের জল শুধু মাঠ ভাসায় না, মানুষের মনও ভাসিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিয়ের পর যে মেয়ে অন্যের সংসারে চলে গেছে, আষাঢ় এলেই তার মনে জেগে উঠত বাপের বাড়ি ফেরার আকুলতা। মায়ের হাতের রান্না, বাবার আদর, ভাই-বোনের গল্প- সবকিছু প্রগাঢ়ভাবে ডাকতো তাকে।
‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে, পুবালী বাতাসে...’
গানটি শুরু হয় প্রকৃতি দিয়ে। আমাদের চোখে ভেসে ওঠে দূরে কিংবা অদূরে নদী ফুলে উঠেছে। আকাশে মেঘ। পুবালী বাতাস বইছে। চারদিক জলমগ্ন। এই পুবালী বাতাস যেন বাপের বাড়ির উঠান থেকে ভেসে আসা স্মৃতির সুবাস। নদীর জল যেন নারীর বুকে জমে থাকা আবেগ। আষাঢ়ের প্রকৃতি এখানে নারীটির অন্তর্জগতের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
‘বাদাম দেইখ্যা, চাইয়া থাকি...’
লোকভাষায় ‘বাদাম’ বলতে নৌকার পালকে বোঝানো হয়েছে। একজন নারী ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। দূরে নদীর বুকে পাল দেখা যায়। তার বুক ধক করে ওঠে। হয়ত নৌকাটা বাবা পাঠিয়েছে, ভাই এসেছে, আজই সে ফিরবে শৈশবের উঠানে। কিন্তু কাছে এলে দেখা যায়, সেটি অন্য কারও নৌকা। এই দৃশ্য বারবার ঘটে। বারবার আশা জন্মায়, আবার ভেঙে যায়। মানুষ যখন কোনো প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করে, তখন প্রতিটি সম্ভাবনাকে সে সেই মানুষটির আগমনের লক্ষণ বলে মনে করে। এই নারীও তেমনি প্রতিটি পালতোলা নৌকায় নিজের স্বপ্নকে খুঁজে ফিরছে।
‘আমার নি কেউ আসে রে...’
এখানে উচ্চস্বরে বিলাপ নেই, আকাশভাঙা আহাজারি নেই, আছে কেবল এক ধরনের ক্লান্ত স্বীকারোক্তি। এই কথার ভেতরে শুধু বর্তমানের কষ্ট নেই, আছে নিজের গুরুত্ব হারানোর ভয়ও। বিয়ের পর বহু নারীই অনুভব করত, বাপের বাড়িতে সে আর আপন মানুষ নেই। একদিকে সে বাপের বাড়ির অতিথি, অন্যদিকে শ্বশুরবাড়িতে বহিরাগত। মাঝখানের এই অবস্থান থেকেই জন্ম নেয় এমন গভীর নিঃসঙ্গতা, অস্তিত্ব সংকট।
‘যেদিন হতে নয়া পানি আইল বাড়ির ঘাটে সখিরে...’
বর্ষার নতুন পানি গ্রামীণ বাংলায় উৎসবের মতো। বিবাহিত মেয়েদের জন্য তা নাইওরের বার্তা। নতুন পানি আসা মানে বাপের বাড়ি যাওয়ার পথ খুলে যাওয়া। এই পানি ঘাট স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে নারীটির মনে শত ভাবনা জেগে ওঠে। আজ কী বাপের বাড়ি থেকে কেউ আসবে? অথবা আগামীকাল, পরশু?
‘অভাগিনীর মনে কত শত কথা উঠে রে...’
মানুষ যখন একা থাকে, তখন স্মৃতি তাকে সবচেয়ে বেশি কাতর করে। ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা এই নারী যেন নিজের ভেতরে ফিরে যায় সে সময়। তার মনে পড়ে শৈশবের বর্ষা, মায়ের আঁচলের নিচে থাকা দিন, বাবার কাছে আবদার, কিশোরীবেলার হাসি কিংবা বাড়ির পুকুর বা আম গাছের কথা। একসময় যে বাড়িটি ছিল তার পৃথিবী, আজ সেখানে যেতে হলে অন্যের অনুমতি লাগে, দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হয়। এই উপলব্ধিই তাকে ‘অভাগিনী’ বানিয়ে দেয়।
‘গাঙ দিয়া যায়রে কত নায় নায়রির নৌকা...’
একটার পর একটা নৌকা যাচ্ছে। কোথাও মেয়েরা হাসছে, গল্প করছে। কোথাও মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দে চোখ চিকচিক করে উঠছে তাদের। নদীজুড়েই যেন উৎসব। কিন্তু ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটির কাছে এই দৃশ্য আনন্দের নয়। এটি তার বঞ্চনার কথা মনে করিয়ে দেয়। অন্যের প্রাপ্তি কখনও কখনও যে নিজের না-পাওয়ার অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তোলে, এই চরণে সেটাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
‘মায়ে ঝিয়ে বইনে বইনে হইতেছে যে দেখা রে...’
বাংলা লোকসংস্কৃতিতে মা-মেয়ের সম্পর্কের আবেগ অত্যন্ত গভীর। কারণ, মেয়ের কষ্ট মায়ের চেয়ে কে বেশি বোঝে? দুজন যে একইরকম অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয় জীবনে।
সে সময় বিয়ের পর মেয়েরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বছরজুড়ে মায়ের মুখ দেখতে পেত না। তাই নাইওর ছিল তাদের পুনর্মিলনের উৎসব। গানের এই চরণ শুনলে ভেসে ওঠে এক মায়াময় দৃশ্য। কোথাও মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরছে, কোথাও দুই বোন কুপিবাতি বা হারিকেনের আলো জ্বেলে রাতভর গল্প করছে। কোথাও বাবা নীরবে বসে মেয়ের মুখ দেখছেন। এই সুন্দর দৃশ্যগুলোর মাঝে গানের নারীটি অনুপস্থিত। সেই অনুপস্থিতিই তার যন্ত্রণার কারণ।
‘আমারে নিল না নায়র পানি থাকতে তাজা...’
এই অংশে অপেক্ষা রূপ নেয় অভিমানে। এখানে কোনো বিদ্রোহ নেই, কিন্তু প্রশ্ন আছে- যখন নদীতে পানি আছে, যাতায়াত সহজ, যখন আরও অনেক মেয়ে যাচ্ছে বাপের বাড়িতে, তখন কেন আমাকে নেওয়া হলো না? এই প্রশ্নের উত্তর মেলে না। উত্তরহীন প্রশ্নই মানুষের হৃদয়ে সবচেয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে।
‘দিনের পথ আধলে যাইতাম, রাস্তা হইত সোজা রে...’
এই চরণের সঙ্গে আগের চরণের সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ অনেক সময় ভাবে- দূরত্ব কমেছে, বাধা কমেছে, সুযোগ এসেছে; এবার নিশ্চয়ই দেখা হবে। কিন্তু জীবন সবসময় সেই সুযোগকে বাস্তবে রূপ দেয় না। তাই এই চরণের মধ্যে রয়েছে অপূর্ণতার হাহাকার।
‘কত লোকে যায়রে নায়র এই না আষাঢ় মাসে...’
এখানে আমরা দেখতে পাই সমাজের এক সামষ্টিক উৎসব। সবাই যাচ্ছে, আপনজনদের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। শুধু সে যেতে পারছে না। এই ‘শুধু আমি নই’ অনুভূতিটিই গানটির মূল ট্র্যাজেডি।
‘উকিল মুন্সির হবে নাইওর কার্তিক মাসের শেষে রে...’
এই চরণে রয়েছে সূক্ষ্ম সামাজিক ব্যঙ্গ। ধনী বা প্রভাবশালী পরিবারের মেয়েদের নাইওর হয় দেরিতে, সুবিধাজনক সময়ে। কিন্তু সাধারণ পরিবারের মেয়েরা আষাঢ়েই নাইওর যায়। এখানে শ্রেণিগত বাস্তবতার ইঙ্গিত আছে। একই সমাজে সবার অপেক্ষার রং যে এক নয়, সেটাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এখানে।
এই গানকে শুধু আবেগের গান ভাবলে ভুল হবে। এটি নারীর সামাজিক অবস্থানেরও দলিল। একসময় গ্রামের মেয়েদের নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছিল সীমিত। বাপের বাড়ি যাবে কী যাবে না, সেটাও অন্যদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করত। তাই নাইওর যাওয়া ছিল এক ধরনের সামাজিক অনুমতি। যেতে না পারাটা ছিল মানসিক বঞ্চনা।
বাংলার লোকগান সময়ের দলিল, সমাজের আয়না, মানুষের অপ্রকাশিত অনুভূতির ভাষা। গ্রামের মানুষের যে কান্না ইতিহাসের বইয়ে লেখা থাকে না- লোকগান সেইসব নীরব ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখে। প্রতি বছর আষাঢ় আসে। নদী ভরে ওঠে। পুবালী বাতাস বইতে থাকে। অসংখ্য নৌকা ঘাটে ভেড়ে। কিন্তু বাংলার লোকস্মৃতিতে আজও এক নারী দাঁড়িয়ে আছে নদীর ধারে। দূরে কোনো পালের নৌকা দেখা দিলেই তার চোখে আশার আলো জ্বলে ওঠে। তারপর নৌকাটি অন্য ঘাটে চলে যায়। তখন সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলে-
‘বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি, আমার নি কেউ আসে রে...’
এই চরণের মধ্যেই হয়ত লুকিয়ে আছে বাংলার গ্রামীণ নারীজীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ, নিঃশব্দ এবং করুণ দীর্ঘশ্বাস।
/মহু