দেশীয় গহনার নকশায় যেমন ফুটে ওঠে বাংলার ঐতিহ্য, তেমনি কবিতা, আবৃত্তি ও রঙতুলির আঁচড়ে প্রকাশ পায় তার শিল্পীসত্তা। কর্পোরেট চাকরির নিরাপদ গণ্ডি ছেড়ে স্বপ্নের ডানায় ভর করে উদ্যোক্তা হয়েছেন মরিয়ম আক্তার এ্যানি। ‘Anny’s Closet’-এর সফল যাত্রার পাশাপাশি সাহিত্য ও শিল্পচর্চায়ও তিনি তৈরি করেছেন নিজস্ব পরিচয়। স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সৃজনশীলতার গল্পে গড়া বহুমাত্রিক জীবন নিয়ে এ্যানি কথা বলেছেন সময়ের আলোর সঙ্গে।
যে কাজ শুরু হয়েছিল ঘরের ভেতর থেকে, তা এখন পৌঁছে গেছে শো-রুমে। এই যাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইলাম এ্যানির কাছে। তিনি বললেন, ‘পড়াশোনা শেষে একটি টিভি চ্যানেলে ৪ বছর কর্মরত ছিলাম। এরপর চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুরু হয় আমার উদ্যোক্তা জীবন। আমার পেইজের নাম Anny's Closet ( এ্যানি'স ক্লোজেট)। শুরুটা খুব ছোট্ট পরিসরে হয়েছিল, সামান্য কিছু পুঁজি দিয়ে। দেশীয় ব্যতিক্রমধর্মী নকশার গহনা হাতে তৈরি করাই আমার প্যাশন। কাঠ, কাপড়, বিডস, কুন্দন, স্টোন, কড়ি, রং এবং বিভিন্ন ধরনের মেটাল দিয়ে তৈরি করা হয় আমাদের গহনা। চুড়ি, কানের দুল, নেকলেস, পায়েল, ব্রেসলেট, আলপনা টিপসহ আরও বিভিন্ন পণ্যের সংগ্রহ রয়েছে নারীদের জন্য। ক্লাইন্টদের ভালোবাসায় এ্যানি'স ক্লোজেট আজ ছোট্ট একটি পেইজ থেকে জায়গা করে নিয়েছে ধানমন্ডি এনাম র্যাংকস শপিংমলে। পার্টনারশিপে সেখানে একটা শো-রুম দিয়েছি। অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ কখনও আমাকে আমাকে স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত হতে দেয়নি। যাত্রাটা কঠিন হলেও এ্যানি'স ক্লজেট মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সবার ভালোবাসা পাবে ইনশাআল্লাহ।’
শো-রুমে এ্যানির হাতে তৈরি বিভিন্ন পণ্য।
উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে কোন ব্যপারটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল- জানতে চাইলে এ্যানি বলেন, ‘অন্যের অধীনে এবং ৯-৫টা রুটিনমাফিক সময়ের বাধ্যবাধকতায় কাজ করা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে ভীষণ কষ্টসাধ্য। কারণ, আমি বরাবরই স্বাধীনভাবে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। মননশীল এবং সৃজনশীল কাজের প্রতি ঝোঁক আমার ছোটবেলা থেকেই। নিজ হাতে তৈরি দেশীয় গহনার মাঝে বাংলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরা এবং নিজস্ব একটা ব্রান্ড তৈরি করার স্বপ্ন রয়েছে আমার। একজন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পেছনে আমার লালিত স্বপ্নই আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করেছে।’
একজন উচ্চশিক্ষিত নারী হয়ে কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে নামমাত্র পুঁজি নিয়ে নিজের স্বপ্নের দিকে পা বাড়ানো সত্যিই ভীষণ চ্যালেঞ্জিং ছিল- বলছিলেন এই স্বপ্নবাজ মানুষ। শুরুর দিকে পরিবার থেকে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা ছিলো। পরবর্তীতে কাজের প্রতি তার একাগ্রতা ও দৃঢ় স্বপ্ন দেখে পরিবার আস্থা রেখেছে এ্যানির ওপর এবং পাশেও থেকেছে।
হাতে তৈরি পণ্যের জন্য পাওয়া এ্যানির পুরষ্কার।
প্রতিবন্ধকতার কথা বলতে গিয়ে এ্যানি বলেন, ‘একজন নারী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার যাত্রাটা কখনোই খুব সহজ ছিলো না। আমার ব্র্যান্ডের পরিচিতি গড়ে তোলার পেছনে অনেক চড়াই উৎড়াইয়ের গল্প আছে। বারবার হোঁচট খেয়ে আবারও শূন্য থেকে শুরু করাটা আমার জন্য ভীষণ কষ্টদায়ক ছিল। কিন্তু আমি কখনও হেরে যেতে শিখিনি। নানাবিধ বাধা যতবার আমাকে ভেঙেছে, আমি দ্বিগুণ উৎসাহ এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে নতুন করে আমার লক্ষ্যের দিকে এগিয়েছি। প্রতিটা প্রতিবন্ধকতাই ছিলো আমার জন্য শিক্ষণীয় এবং প্রেরণার উৎস। তাই সফলতার লক্ষ্যে পৌঁছাবার যাত্রাটা এখনও চলছে।’
উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের কাজ করার জন্য বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিবেশ কতটুকু অনুকূল বলে মনে করেন? এই প্রশ্নের জবাবে এ্যানি বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের চলার পথ কখনোই মসৃণ নয়। সমাজের নানান প্রতিবন্ধকতা নারীদের জন্য কাজের পরিবেশ অনেকটাই কঠিন ও সীমাবদ্ধ করে তোলে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীদের প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়েই নিজের স্বপ্ন এবং সফলতার লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়।’
ব্যাবসা নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও জানালেন এ্যানি। তিনি চান, তার ব্রান্ডটি একদিন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছাবে। তার কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানবে ভিন্ন দেশের, ভিন্ন ভাষার মানুষেরা।
উদ্যোক্তা হিসেবে যারা আত্মপ্রকাশ করতে ইচ্ছুক, তাদের উদ্দেশ্যে এ্যানি বলেন, ‘চাকরির পেছনে না ছুটে, কর্মহীন না থেকে, সময় নষ্ট না করে তরুণ সমাজের উচিত নিজ যোগ্যতা এবং সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানো। ছোট প্ল্যাটফর্ম থেকে হলেও নিজেকে আত্মপ্রকাশ করানো উচিত।’
প্রাপ্তির কথা বলতে গিয়ে এ্যানি বলেন, ‘আমার তৈরি এক একটি গহনা ভিন্ন ভিন্ন গল্পের প্রতিচ্ছবি। যা অন্যের মুখে হাসি, আনন্দের খোরাক হয়ে ওঠে। এসব অলংকার একজন নারীর সৌন্দর্যকে দ্বিগুণ করে তোলে। আমি মনে করি, এটাই আমার প্রাপ্তি, অহংকার ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি।’
৫টি কাব্যগ্রন্থ ও ১টি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে এ্যানির।
এই কর্মমুখবর জীবনের পাশাপাশি সমানতালে এ্যানি সামলে যাচ্ছেন তার শিল্প-সাহিত্য জগৎ। সে বিষয়ে স্বপ্নবাজ ও শৈল্পিক এ মানুষটা বলেন, ‘বড় হওয়ার পর সাহিত্য জগতে আমার বিচরণ শুরু হয়। তারপর ভালোলাগা এবং মনের খোরাক থেকেই লিখতে শুরু করি। বিগত আট-দশ বছর ধরে লিখছি। এ পর্যন্ত আমার ৫টি কাব্যগ্রন্থ ও ১টি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে।’
এ্যানি শুধু কবিতা লিখেন না, তা কণ্ঠেও ধারণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি কবিতার মানুষ, কবিতার মাঝেই আমার বসবাস। কবিতা শুধু লিখতেই নয় বরং কণ্ঠে ধারণ করতেও ভালোবাসি। বিগত ৬ বছর ধরে আবৃত্তির সঙ্গে আমার পথচলা।’
প্রদর্শনীতে এ্যানির আঁকা চিত্রকর্ম।
শিল্পজগতের অন্য একটি দিক ছবি আঁকা। সেখানেও রয়েছে তার পদচারণা। রঙিন সেই জগতের কথা বলতে গিয়ে এ্যানি বলেন, ‘লেখালেখি ও আবৃত্তির মতো রংতুলিও আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্বপ্নগুলোকে ক্যানভাসে তুলে ধরার মাঝেই আমি আনন্দ খুঁজে পাই। বিভিন্ন প্রদর্শনীতে আমার আঁকা ছবি স্থান পায়।’
এ্যানির আঁকা চিত্রকর্ম।
লেখা, আবৃত্তি, ছবি আঁকা ছাড়াও অনলাইন প্লাটফর্মসহ বিভিন্ন অঙ্গনে প্রোগ্রাম সঞ্চালনা করেন এ্যানি। উপস্থাপনা তার ভালোলাগার একটি কাজ।
বহুমুখী প্রতিভার এই নারীর জন্ম কাতারে হলেও তার বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে। বাংলার আলো-হাওয়া ভালোবেসে উন্নত জীবনের আহ্বান ফেলে থেকে গেছেন দেশের মাটিতেই। ৫ ভাইবোনের মাঝে এ্যানি দ্বিতীয়। তিনি স্কুল-কলেজের শিক্ষা জীবন শেষ করেছেন ময়মনসিংহ শহরে। তারপর বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করেছেন রাজধানী শহর ঢাকা থেকে। এখন সেই শহরেই কাটছে এ্যানির ব্যস্তময় শিল্প ও উদ্যোক্তা জীবন।