প্রতি বছর বর্ষা এলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। চিকিৎসক হিসেবে ডেঙ্গু রোগী দেখার সময় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো রোগটি নিয়ে মানুষের মধ্যে একদিকে ভয়, অন্যদিকে কিছু ভুল ধারণা। অনেকেই জ্বর হলেই ধরে নেন ডেঙ্গু হয়েছে, আবার কেউ কেউ পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দেরি করেন। অথচ ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে রোগের গতিপ্রকৃতি বুঝে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গুর শুরুটা অনেক সময় সাধারণ ভাইরাস জ্বরের মতোই। হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব কিংবা রুচি কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কারও কারও ত্বকে র্যাশও হয়। ফলে শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তাই এ ধরনের বিষয় দেখলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।
তবে ডেঙ্গুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বর কমে যাওয়ার পরের সময়টি। অনেক রোগী জ্বর কমে গেলে মনে করেন তিনি সুস্থ হয়ে গেছেন। বাস্তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এই সময়েই জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই জ্বর কমে যাওয়াকে সবসময় সুস্থতার চূড়ান্ত লক্ষণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
রোগী দেখার সময় আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য করি তিনি পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করছেন কি না, প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিক আছে কি না এবং নতুন কোনো সতর্কসংকেত দেখা দিচ্ছে কি না। প্রচণ্ড পেটব্যথা, বারবার বমি, অস্বাভাবিক রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট, তীব্র ঘুম ভাব কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।
ডেঙ্গু নিয়ে আরেকটি বড় ভুল ধারণা হলো- প্লাটিলেট কমলেই প্লাটিলেট দিতে হবে। বাস্তবে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যাওয়াই প্লাটিলেট দেওয়ার একমাত্র কারণ নয়। রোগীর রক্তপাত হচ্ছে কি না, সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা কেমন এবং চিকিৎসকের মূল্যায়ন কী বলছে, সেগুলো বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাই রিপোর্ট হাতে নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ার প্রবণতাও বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে জ্বরের সময় কোন ব্যথানাশক বা জ্বরের ওষুধ নেওয়া নিরাপদ, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা উচিত। পর্যাপ্ত পানি, ওরস্যালাইন, স্যুপসহ সহনীয় তরল খাবার গ্রহণ এবং হালকা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। তবে বমি বা অন্য কোনো কারণে মুখে তরল রাখা সম্ভব না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ডেঙ্গু চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রোগী ও পরিবারের সদস্যদের সচেতন রাখা। সব ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় না, আবার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালে যেতে দেরি করাও ঠিক নয়। কাদের বাড়িতে চিকিৎসা সম্ভব আর কাদের হাসপাতালে পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন, সেটি রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু রোগী বা পরিবারের নয়, পুরো সমাজের। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা, ফুলের টব, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা যেসব স্থানে পানি জমতে পারে সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি। একজন চিকিৎসক হিসেবে রোগীদের কাছে আমার বার্তা একটাই- ডেঙ্গুকে ভয় নয়, অবহেলাও নয়। জ্বর হলে সচেতন হোন, বিপদসংকেত চিনুন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও নিউরোলজি
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে