যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এডওয়ার্ডস বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই সোমবার মার্কিনিদের গর্বখ্যাত একটি বি-৫২ বোমারু বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে বিমানের ৮ ক্রু সদস্যই নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বিমানঘাঁটি কর্তৃপক্ষ। ১৯৮২ সালের পর বি-৫২ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় এটাই সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা। সেবার স্যাক্রামেন্টোর কাছে মাদার এয়ার ফোর্স বেসে প্রশিক্ষণ চলাকালীন ৯ ক্রু সদস্য প্রাণ হারিয়েছিলেন।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী সোমবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ২০ মিনিটে বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস বিমানটি রুটিন টেস্ট মিশনে অংশ নিতে উড্ডয়ন করেছিল। বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর এলাকাজুড়ে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলি তৈরি হয়। বিমানঘাঁটির জরুরি উদ্ধারকারী দল সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। চিফ মাস্টার সার্জেন্ট জোশুয়া টি. স্কারলোকেন জানান, বিমানটিতে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা, সরকারি বেসামরিক কর্মকর্তা ও সরকারি ঠিকাদার ছিলেন।
বিমানটির উৎপাদনকারী বোয়িং জানিয়েছে, সোমবারের ওই ফ্লাইটে তাদের দুজন কর্মী ছিলেন। মার্কিন এয়ার ফোর্সের সেক্রেটারি ট্রয় ই. মিঙ্ক ও হাউস স্পিকার মাইক জনসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন।
বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, রাডার আধুনিকীকরণ কর্মসূচির পরীক্ষার অংশ হিসেবে বি-৫২ বিমানটি উড্ডয়ন করেছিল। সিএনএনের সহযোগী সংবাদমাধ্যম কেসিএএলের ফুটেজে দেখা যায়, বালিময় রানওয়েতে একটি বড় কালো দাগ তৈরি হয়েছে। রানওয়েতে ধোঁয়াও দেখা গেছে, তবে ধ্বংসস্তূপের সুনির্দিষ্ট অংশ চেনা কঠিন।
ঘটনার তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছে সামরিক কর্তৃপক্ষ। তবে বিস্তারিত তথ্য জনসাধারণের কাছে পৌঁছাতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগতে পারে। এডওয়ার্ডস বিমানঘাঁটি পরীক্ষামূলক ফ্লাইটের জন্য ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘ রানওয়ে থাকায় এখানে শুধু বিমানবাহিনীর বিমান নয়, হেলিকপ্টার, ড্রোন এমনকি স্পেস শাটলও পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।
মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কমান্ডার ও পি-৩ পাইলট রিচার্ড কোলকো বলেন, পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের জন্য সাধারণত সবচেয়ে দক্ষ পাইলট ও ক্রুদেরই বেছে নেওয়া হয়। কীসের পরীক্ষা চলছে, তার ওপর ভিত্তি করে বিমানে কখনো কখনো বেসামরিক ইঞ্জিনিয়ার কিংবা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও থাকেন। যেকোনো দুর্ঘটনা সামাল দিতে এই ঘাঁটিতে একটি চৌকস জরুরি উদ্ধারকারী দল রয়েছে বলেও জানান তিনি।
কোলকো বলেন, কর্মকর্তাদের এখনকার প্রধান কাজ হলো দুর্ঘটনাস্থল সুরক্ষিত করা, নিহতদের দেহাবশেষ ও সম্ভাব্য সব তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা, বিমানের রক্ষণাবেক্ষণের নথিপত্র খতিয়ে দেখা এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সবকিছুর চুলচেরা বিশ্লেষণ করা। সোমবার দুর্ঘটনার শিকার হওয়া বি-৫২ বিমানটি মার্কিন বিমানবাহিনীর অন্যতম পুরোনো যুদ্ধবিমান। ১৯৫৫ সালে এটি প্রথম বাহিনীতে যোগ দেয়। দূরপাল্লার এই ভারী বোমারু বিমানটিতে সাধারণত পাঁচজন ক্রু থাকেন।
বিমানটি প্রায় ৭০ হাজার পাউন্ড বোমা ও অন্যান্য গোলাবারুদ বহনে সক্ষম। বর্তমানে সচল সংস্করণ বি-৫২এইচ এখনও মার্কিন বিমানবাহিনীর অস্ত্রাগারের বড় অংশজুড়ে রয়েছে। এ দুর্ঘটনার আগে মার্কিন বহরে এমন ৭৬টি বিমান ছিল। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধে বোমাবর্ষণের জন্য বি-৫২ বিমান ব্যবহার করা হয়েছে। বি-৫২এইচ পারমাণবিক বোমা ও পারমাণবিক অস্ত্রবাহী ক্রুজ মিসাইলও বহন করতে পারে।
সোমবারের দুর্ঘটনার আগে বি-৫২ বিমান সর্বশেষ প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় পড়েছিল ২০০৮ সালে। সে বছর গুয়াম উপকূলে একটি কুচকাওয়াজের ফ্লাইওভারের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় প্রশান্ত মহাসাগরে একটি বি-৫২ ভেঙে পড়ে। তাতে প্রাণ হারান বিমানবাহিনীর ছয় কর্মী।
বোয়িংয়ের তৈরি এই বোমারু বিমানটির উৎপাদন ১৯৬২ সাল থেকেই বন্ধ আছে। তবে আয়ু বাড়ানোর বেশ কিছু উদ্যোগের মাধ্যমে এয়ারফ্রেমকে আধুনিকীকরণ করে একে উড্ডয়নযোগ্য রাখা হয়েছে। ডিফেন্স নিউজের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন বিমানবাহিনী সম্প্রতি নতুন ইঞ্জিন তৈরির লক্ষ্যে বি-৫২-এর আরেকটি আপগ্রেড প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮.৬ বিলিয়ন ডলার।
এই বিমানটি যেহেতু আর নতুন করে তৈরি হয় না, তাই এর কোনো যন্ত্রাংশ বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হলে অ্যারিজোনার ডেভিস-মন্টহ্যান বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত ‘বোনইয়ার্ড’ নামে পরিচিত জায়গায় সংরক্ষিত বাতিল বিমানের এয়ারফ্রেম থেকে তা সংগ্রহ করতে হয়। ২০১৬ সালে গুয়ামে এক দুর্ঘটনায় একটি বি-৫২এইচ সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার পরও ঠিক এই পদ্ধতিই অবলম্বন করা হয়েছিল। ওই দুর্ঘটনায় অবশ্য কেউ প্রাণ হারায়নি।
/এসএকে