অদম্য রিভার অভিযাত্রা

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট শুধু একটি পাহাড় নয়, এটি মানুষের সাহস, ধৈর্য ও স্বপ্নের চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রতীক। সেই কঠিন

2026-06-17T05:19:21+00:00
2026-06-17T05:19:21+00:00
 
  বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৮ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
অদম্য রিভার অভিযাত্রা
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৫:১৯ এএম 
ইতিহাস গড়েছেন ৩১ বছর বয়সি আফগান নারী জাকিয়া আহমেদ। ছবি : সংগৃহীত
পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট শুধু একটি পাহাড় নয়, এটি মানুষের সাহস, ধৈর্য ও স্বপ্নের চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রতীক। সেই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইতিহাস গড়েছেন ৩১ বছর বয়সি আফগান নারী জাকিয়া আহমেদ, যিনি ‘রিভার’ নামেও পরিচিত। ২০২৬ সালের ২১ মে, নেপাল সময় সকাল ৭টা ২০ মিনিটে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে (৮,৮৪৯ মিটার) পা রেখে তিনি প্রথম আফগান নারী হিসেবে এই অনন্য ইতিহাস গড়েন।

প্রথম আফগান নারী হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখে তিনি বিশ্বকে দেখিয়েছেন কোনো কিছুই নারীর স্বপ্নকে খাঁচাবন্দি করতে পারে না। রিভার এই অর্জন যেমন ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, তেমনি একটি পর্বতশৃঙ্গ স্পর্শ করার গল্পও নয়। এটি এমন এক দেশের নারীদের পক্ষ থেকে উচ্চারিত প্রতিবাদের ভাষা, যেখানে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং স্বাধীন চলাফেরার অধিকার আজও নানা বাধার মুখে। তার এভারেস্ট জয় তাই একটি পর্বতশৃঙ্গ স্পর্শের গল্পের চেয়েও অনেক বড় কিছু।

আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশের একটি রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেওয়া রিভার শৈশব কেটেছে সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। ছোটবেলা থেকেই পাহাড়ের প্রতি ছিল তার গভীর আকর্ষণ। স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রতিদিন দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হতো। সেই পথচলাতেই জন্ম নেয় বড় স্বপ্ন দেখার সাহস।

তবে তার জীবন সহজ ছিল না। কৈশোরে উচ্চশিক্ষার জন্য কাবুলে যাওয়ার পথে তালেবান হামলার মুখে পড়েন তিনি। ভয়াবহ সেই হামলা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও জীবনের বাস্তবতা বদলে যায়। পরবর্তীতে সাংবাদিকতা শুরু করলেও নিরাপত্তাহীনতা তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। ২০১৯ সালে পরিবারের সঙ্গে শরণার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে নতুন জীবন শুরু করেন।

শরণার্থী জীবনের সংগ্রামের মাঝেও রিভা তার স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি। পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করেন কঠোর পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ। ইউরোপের মাউন্ট ব্লাঙ্ক এবং নেপালের মেরা পিক জয় করে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করেন বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের জন্য।

এভারেস্ট অভিযানের সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো ৮ হাজার মিটারের ওপরে অবস্থিত ‘ডেথ জোন’। সেখানে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ এত কম যে প্রতিটি পদক্ষেপই জীবন-মৃত্যুর লড়াই। কিন্তু সেই কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার সময় রিভার মনে ছিল আফগানিস্তানের অসংখ্য মেয়ের মুখ, যারা আজও স্বাধীনভাবে স্বপ্ন দেখার সুযোগ পায় না।

অবশেষে ২১ মে ভোরে তিনি এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান। চারদিকে বরফে মোড়া অসীম সাদা বিস্তারের মধ্যে দাঁড়িয়ে তার চোখে নেমে আসে আবেগের অশ্রু।

স্যাটেলাইট ফোনে বেসক্যাম্পে প্রথম কথা বলার সময়ই তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘দয়া করে আমার মাকে ফোন করুন! মাকে জানান আমি পেরেছি।’ কারণ এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত বিজয় ছিল না; এটি ছিল আফগান নারীদের অদম্য সম্ভাবনার প্রতীকী বিজয়।

জাকিয়া আহমেদ রিভারের এই জয় বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছে যে, সুযোগ ও পরিবেশ পেলে আফগান নারীরাও পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে। তার এই গৌরবময় অধ্যায় বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত নারী ও শরণার্থীদের জন্য এক নতুন সাহসের নাম। বরফে ঢাকা এভারেস্টের চূড়ায় তার উত্তোলিত হাত আজ আফগানিস্তানের লাখো গৃহবন্দি কিশোরীকে জানান দিচ্ছে অন্ধকার যতই দীর্ঘ হোক না কেন, ভোরের আলো একদিন আসবেই।

রিভারের এই সাফল্য বিশ্বকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, সুযোগ ও স্বাধীনতা পেলে নারীরা যেকোনো উচ্চতা স্পর্শ করতে পারে। সমাজের বাধা, যুদ্ধ কিংবা বৈষম্য কোনো কিছুই মানুষের স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারে না।

আজ জাকিয়া আহমেদ রিভার এভারেস্ট জয় লাখো নারীর জন্য অনুপ্রেরণার নাম। তার গল্প আমাদের শেখায়, সাহস আর অধ্যবসায় থাকলে একদিন না একদিন আলোয় পৌঁছানো সম্ভব। এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়ে রিভা যেন বিশ্বকে একটাই বার্তা দিয়েছেন- নারীরা দমে যাওয়ার জন্য নয়, তারা জন্মেছে নিজেদের আকাশ জয় করার জন্য।

/এসএকে
  বিষয়:   অদম্য  রিভার  অভিযাত্রা  আফগানিস্তান 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: