শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের আওতায় তেহরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বৈশ্বিক বিনিয়োগ তহবিল গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন জোরালোভাবে বলছে, এই তহবিলটি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া কোনো সরাসরি অর্থ বা নগদ প্রণোদনা নয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট তৈরি করা দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটাতে যে বৃহত্তর কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা হচ্ছে, এটি তারই একটি কৌশলগত অংশ।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত সোমবার (১৫ জুন) সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, এই অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো সম্পূর্ণভাবে চুক্তির শর্তাবলি মেনে চলার ক্ষেত্রে ইরানের ‘যোগ্যতা’ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করবে। ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ববর্তী ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির তীব্র সমালোচনার পটভূমিতে এই ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্কটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমত নিয়ন্ত্রণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটর্মে লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ৩০ কোটি (৩০০ বিলিয়ন) ডলার দিচ্ছে— এই খবরটি সম্পূর্ণ ভুয়া।”
ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সও স্পষ্ট করেছেন, ওয়াশিংটন তেহরানকে কোনো মার্কিন অর্থ দিচ্ছে না; বরং ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের অনুমতি দেয়, তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে ইরানে বেসরকারি বিনিয়োগের একটি বড় পথ উন্মুক্ত হবে।
জব্দ করা সম্পদ নিয়ে ধোঁয়াশা :
এই চুক্তির ফলে ইরানের দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ ও জব্দকৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ মুক্তির বিষয়েও ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ‘মেহর নিউজ এজেন্সি’ দাবি করেছে, ১৪ দফার এই খসড়া সমঝোতা স্মারকে বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট এই নির্দিষ্ট অঙ্কের কথা অস্বীকার করে বলেছেন, দ্বিপাক্ষিক নথিতে এমন কোনো সংখ্যার উল্লেখ নেই। তবে তারা পারমাণবিক চুক্তির শর্তসাপেক্ষে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও সম্পদ অবমুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
বর্তমানে ১৯৪২ সালের পর সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ও যুদ্ধের কারণে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া ইরানের জন্য এই তহবিল একটি বড় অর্থনৈতিক সুবিধা হতে পারে। তবে আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি তেহরানের জন্য একধরনের ‘মর্যাদার সংকট’ তৈরি করেছে। কারণ, তেহরান এটি স্বাধীন বা সার্বভৌম কোনো তহবিল হিসেবে পাচ্ছে না, বরং এটি অত্যন্ত কঠোর আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান ও শর্তসাপেক্ষ একটি অর্থনৈতিক প্যাকেজ।
আলোচনায় থাকবে আরও যেসব বিষয় :
চুক্তির পর আগামী ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালীন বেশ কিছু অমীমাংসিত ও জটিল আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের ৪৪০ কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালি টোলমুক্তভাবে স্থায়ীভাবে খুলে দেওয়া।
এছাড়া, লেবাননের ওপর ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান এই চুক্তির স্থায়িত্বকে বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ইরান যেখানে লেবাননকে চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাচ্ছে, সেখানে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তেহরানের চুক্তির তোয়াক্কা না করে তেল আবিব লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত রাখবে।
চুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া :
এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক নিয়ে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এই চুক্তিটি অনুমোদন করেছে। তবে দেশটির কট্টরপন্থী অনেক পর্যবেক্ষক এই চুক্তির সময় নির্বাচন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘ন্যায়সংগত’ বলে আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেছেন যে, এই চুক্তির পর ইরান আর কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না।
মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এই চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। মার্কিন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় শিবিরের আইনপ্রণেতারা এই চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এর শর্তাবলির পূর্ণ স্বচ্ছতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
সময়ের আলো/জেডি