সরকারি অর্থে পার্বত্য এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও বান্দরবানের রুমা উপজেলায় তার সুফল মিলছে না। নির্মাণ শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই কোথাও উঠে যাচ্ছে পিচ, আবার কোথাও দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম অনিয়ম এবং যথাযথ তদারকির অভাবেই ভেস্তে যাচ্ছে সরকারের এই উন্নয়ন উদ্যোগ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) বাস্তবায়িত ‘পাহাড়ে স্থানীয় গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নির্মিত ও নির্মাণাধীন কয়েকটি সড়কের কাজের মান নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা গেছে।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে রুমা-রোয়াংছড়ি অভ্যন্তরীণ সংযোগ সড়ক থেকে পাইন্দু হেডম্যান পাড়া পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটিকে ঘিরে। এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই প্রকল্পের আওতায় ১ কিলোমিটার ৩০০ মিটার সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৭৫ লাখ ৬৯ হাজার ৬১০ টাকা। এর মধ্যে ছয়টি স্থানে ৭৫ মিটার দৈর্ঘ্যের রিটেইনিং ওয়াল (সুরক্ষা দেয়াল) নির্মাণের কাজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষিত যুবসমাজের প্রতিনিধি ছোহ্লামং মারমা, এবাই মং মারমা ও উক্য থোয়াই মারমা অভিযোগ করেন, ২০২১-২২ অর্থবছরে একই সড়কের প্রথম ধাপের প্রায় ১ হাজার ৫০ মিটার পিচঢালাইয়ের কাজ ২০২৪ সালে শেষ হয়। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানের পিচ উঠে গিয়ে রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সেই ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কার না করেই বাকি অংশে নতুন নির্মাণকাজ শুরু করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
সরেজমিনে স্থানীয়রা জানান, নির্মাণাধীন সড়কের প্রটেকশন ও রিটেইনিং ওয়ালে গুণগত মানের বালুর পরিবর্তে নিম্নমানের পাহাড়ি বালি ব্যবহার করা হচ্ছে। সাববেইস ও মেকাডমের কাজেও মানসম্মত ইটের খোয়া দেওয়া হচ্ছে না, উল্টো ব্যবহার করা হচ্ছে পাহাড়ি মাটি। এমনকি দিনের আলো লুকিয়ে রাত ১০টা থেকে ১১টার দিকে আঁধারে প্রটেকশন ওয়ালের ঢালাই কাজ করতে দেখা গেছে।
পাইন্দু ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গংবাসে মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখানে যে কাজ হচ্ছে তা অত্যন্ত নিম্নমানের। ব্যবহৃত ইটের মান খুবই খারাপ। আমি বাধা দিলেও ঠিকাদারের লোকজন শোনেনি। রাতে মাটিসহ ঢালাই দিয়ে সাইট ওয়ালের কাজ করা হচ্ছে।
চাঁদের গাড়িচালক উক্যথোয়াই মারমা জানান, রাস্তাটির মান খারাপ হওয়ায় গাড়ি চালাতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় এবং সবসময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে।
পাইন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উহ্লামং মারমা বলেন, অনেক চেষ্টা করে এলজিইডির মাধ্যমে এ রাস্তাটি পাস করিয়েছিলাম। কিন্তু প্রথম ধাপের রাস্তা এক বছরের মধ্যেই ভেঙে গেছে। দ্বিতীয় ধাপের কাজ নিয়েও এলাকাবাসীর বিস্তর অভিযোগ। নিম্নমানের ইট, রড ও নদীর বালি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে শুনেছি। বিষয়টি এলজিইডিকে একাধিকবার জানিয়েও কোনো কার্যকর সুরাহা পাইনি।
কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মো. হানিফ স্থানীয়দের বলেন, আমাকে বলে লাভ নেই, পারলে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে অভিযোগ করেন। আমরা উনার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছি। তবে মূল ঠিকাদার মো. আনিছুর রহমান মেহেদী দাবি করেন, এলজিইডি অফিস থেকে মৌখিকভাবে কিছু অভিযোগের কথা জানানো হয়েছে, অফিস তদন্ত করে ত্রুটি পেলে ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে, সরেজমিন পরিদর্শনের সময় তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা এলজিইডির ফিল্ড অফিসার (এসও) বিদ্যুৎ চরণ ধর সজিবকে নির্মাণস্থলে পাওয়া যায়নি। পরে পাইন্দু পাড়ার একটি চায়ের দোকানে তাকে পাওয়া গেলে তিনি দাবি করেন, ঠিকাদারের অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের বিষয়ে জেলা কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ পাঠানো হয়েছে। ঠিকাদারকে বারবার সতর্ক করলেও তিনি কথা শুনছেন না।
অভিযোগের বিষয়ে বান্দরবান এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী প্রতিপদ দেওয়ান বলেন, রাস্তা নির্মাণের পর কিছু অংশে ভাঙন দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোনো রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরবর্তী বরাদ্দ এলে তা মেরামত করা হবে। এছাড়া ঠিকাদারের এক বছরের জামানত (সিকিউরিটি মানি) রয়েছে, প্রয়োজনে সেই অর্থ থেকেও সংস্কার করা হবে। সব সড়ক নিজে পরিদর্শন করেননি জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণত একটি সড়কের স্থায়িত্ব ৪ থেকে ৫ বছর হয়, এরপর সরকারি অর্থায়নে আবার সংস্কার করা হয়।
সময়ের আলো/জোই