যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল আলোচিত একটি সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। এই চুক্তির আওতায় লেবানন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িক শিথিল করা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তির পথ তৈরির কথা বলা হয়েছে। যদিও চুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে ব্লুমবার্গ নিউজ ও আল আরাবিয়া প্রকাশিত চুক্তির ১৪ দফার খসড়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এতে কোনো চূড়ান্ত সমাধান নেই। তবে তেহরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না। এছাড়া উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ এবং অন্যান্য পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
চুক্তির প্রধান দফাগুলো
১. যুদ্ধের অবসান
চুক্তিতে বলা হয়েছে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে চলমান যুদ্ধের ‘তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী’ সমাপ্তি ঘটবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই নিজেদের এবং মিত্রদের মাধ্যমে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বা শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করবে।
২. সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান
দুই দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
৩. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
৪. মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার
চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন বাহিনী আশপাশের এলাকা থেকে প্রত্যাহার করা হবে।
৫. হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক চলাচল
ইরান অবিলম্বে এমন পদক্ষেপ নেবে যাতে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে ফিরে আসে এবং পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের মধ্যে বাণিজ্যিক নৌপরিবহন স্বাভাবিক হয়।
৬. ৩০০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন তহবিল
যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দেবে।
৭. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
৮. পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির অঙ্গীকার
ইরান পুনরায় ঘোষণা করবে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামসহ অন্যান্য পারমাণবিক বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
৯. স্থিতাবস্থা বজায় রাখা
চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে নতুন কোনো পরিবর্তন আনবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াবে না।
১০. ইরানি তেল রফতানিতে ছাড়
নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানি অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন সেবার জন্য বিশেষ ছাড় দেবে।
১১. জব্দকৃত অর্থ ফেরত
আলোচনার অগ্রগতির ভিত্তিতে ইরানের জব্দ বা সীমাবদ্ধ করা অর্থ ও সম্পদ ধীরে ধীরে মুক্ত করে দেওয়া হবে।
১২. বাস্তবায়ন তদারকি ব্যবস্থা
চূড়ান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে একটি যৌথ তদারকি ব্যবস্থা গঠন করা হবে।
১৩. পরবর্তী আলোচনা
নির্দিষ্ট কয়েকটি ধারা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা পাওয়ার পর বাকি বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনায় বসবে দুই দেশ।
১৪. জাতিসংঘের অনুমোদন
চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
সময়ের আলো/ ইউএমএইচ