মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে জানিয়েছে, ইরান এখন থেকে যেকোনো মুহূর্তে নিজের ইচ্ছামতো কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিতে পারে। এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে অবগত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান যুদ্ধের ফলে তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার এক শক্তিশালী নতুন ক্ষমতা অর্জন করেছে।
শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দারা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, এই চুক্তি সত্ত্বেও ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা চাইলে এই জলপথ বন্ধ করতে সক্ষম এবং ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি ঘটার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র সিএনএন-কে বলেছে, ‘আমরা এখন প্রণালিটির ওপর ইরানের কার্যত নিয়ন্ত্রণ মেনে নিয়েছি— যা যেকোনো পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী একটি অর্থনৈতিক অস্ত্র।’ সূত্রটি জোর দিয়ে বলে, এই যুদ্ধ ভবিষ্যতে একই ধরনের কৌশল ব্যবহারের বিষয়ে তেহরানের নীতি ও চিন্তাভাবনাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।
অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশলে সফল তেহরান :
দ্বিতীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে নিখুঁত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ইরান। এর ফলে তারা শিখেছে যে, এই সক্ষমতাকে একটি ‘অপ্রতিসম হাতিয়ার’ (অ্যাসিম্যাট্রিক ক্যাপাবিলিটি) হিসেবে ভবিষ্যতে নিজেদের সুবিধার্থে দর-কষাকষির কাজে লাগানো সম্ভব।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের পরও ইরানের সামরিক সক্ষমতার একটি বড় অংশ অক্ষত রয়েছে। তেহরানের অস্ত্রভাণ্ডারে এখনো বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং শত শত ছোট দ্রুতগামী নৌযান রয়েছে, যা দিয়ে তারা হরমুজ প্রণালিতে মাইন পাতা ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে অনায়াসে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
পেন্টাগনের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের ধারণার চেয়েও দ্রুতগতিতে ইরান তার সামরিক ভিত্তি পুনর্গঠন করছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভুল হিসাব :
মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করছেন, বর্তমান সংকটটি মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ভুল হিসাবের দীর্ঘস্থায়ী ফল। যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করেছিল, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের নিজেরই অর্থনৈতিক ক্ষতি বেশি হবে। এ ছাড়া ওয়াশিংটন আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, চীন তার নিজের স্বার্থেই ইরানকে এই পথ বন্ধ করতে দেবে না।
ফলস্বরূপ, ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোকে অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কিন হিসাব ও কৌশল সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়। সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত একটি সূত্র স্বীকার করেছে, ‘প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ হারানো এই যুগের সবচেয়ে বড় ভুল। এখন বিপুল পরিমাণ সামরিক মহড়া ছাড়া এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের আর কোনো উপায় নেই।’
হুথিদের ব্যবহার করে ‘চরম পদক্ষেপের’ ছক :
চুক্তি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা চললেও একাধিক সূত্র সতর্ক করেছে যে, যদি কোনো কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই আলোচনা ভেস্তে যায়, তবে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে একটি ‘চরম পদক্ষেপ’ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরান তাদের ইয়েমেনি প্রক্সি বাহিনী হুথিদের নির্দেশ দিয়ে বাব-এল-মানদেব প্রণালিও সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দিতে পারে। লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী এই জলপথটি মূলত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার সময়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান লাইফলাইন হিসেবে কাজ করেছে।
গোয়েন্দারা বলছেন, হরমুজ ও বাব-এল-মানদেব— এই দুটি সংকীর্ণ জলপথ একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি অচল হয়ে পড়বে।
ভ্যান্স ও ট্রাম্পের ভিন্ন দাবি :
অবশ্য মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা এই গোয়েন্দা মূল্যায়নের মধ্যেও নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য খুঁজছেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিএনএন-কে বলেন, ইরান যে শেষ পর্যন্ত চুক্তি করতে রাজি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ হলো তারা বুঝতে পারছে যে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের সেই একচেটিয়া প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসছে।
এদিকে ফ্রান্সের জি-৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রণালিটি ইতোমধ্যে আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে এবং শুক্রবার এটি সম্পূর্ণ ‘টোলমুক্ত’ উপায়ে উন্মুক্ত হবে।
তবে ট্রাম্পের এই আশাবাদের বিপরীতে নৌপরিবহণ বিশেষজ্ঞ ও বিমা কোম্পানিগুলো বলছে, চুক্তির অস্পষ্টতা ও সাগরে ছড়িয়ে থাকা মাইনের ঝুঁকির কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও বহু দিন লেগে যেতে পারে।
সময়ের আলো/জেডি