পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক তাদের নতুন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আনুষ্ঠানিক নাম দিয়েছে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’। তিন দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর তুরস্কের ইস্তানবুুলে এ নাম ঘোষণা করা হয়। সোমবার ইস্তানবুুলে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে জোটের একটি সচিবালয় স্থাপন করা হয়েছে। এর প্রথম মহাসচিব পাকিস্তান থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে।
হাকান ফিদান বলেন, অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাসহ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার মতো আন্তর্জাতিক নীতির ওপর ভিত্তি করে জোটটি গড়ে উঠেছে। এ অঞ্চলের অন্য যেকোনো দেশের অংশীদারিত্ব ও অংশগ্রহণের জন্য জোটটি উন্মুক্ত থাকবে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার গত রোববার তুরস্কে পৌঁছান। ইসহাক দার লন্ডন থেকে সেখানে যান। এর আগে তিনি যুক্তরাজ্যে আলাদা একটি সফর শেষ করেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছিলেন যে সোমবারের আলোচনায় মিসরও থাকতে পারে। তবে প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য নয়; বরং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা করে আসা চার দেশের অংশ হিসেবে। এই চার দেশ মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
এই চার দেশ সর্বশেষ গত ৫ আগস্ট জর্ডানের রাজধানী আম্মানে বৈঠক করেছিল। এর আগে গত জুনে মিসরের রাজধানী কায়রোতে দেশগুলোর বৈঠক হয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়টিকে সেই বৈঠকে স্বাগত জানানো হয়। তবে সোমবারের বৈঠকের মূল আলোচনায় ছিল পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করা তিন দেশ।
৭ আগস্ট মক্কায় পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি এখন চুক্তিতে থাকা রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তবায়নের উপযোগী কাঠামোয় রূপ দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। ওই অঙ্গীকার অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে জোটটির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কীভাবে কাজ করবে বা কোন পরিস্থিতিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার এ ধারা কার্যকর হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
নতুন সদস্য নেওয়ার প্রক্রিয়া
জোটটি প্রতিষ্ঠিতই হয়েছে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে। নতুন গঠিত কমিটি জোটের রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কর্মসূচি এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে বলে বৈঠক শেষে জানিয়েছেন ফিদান। মিসরসহ অন্য দেশগুলো এই চুক্তিতে যোগ দিতে পারবে কি না, জানতে চাইলে ফিদান বলেন, ‘এটি অবশ্যই সম্ভব।’ তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সদস্য হওয়ার শর্ত, প্রক্রিয়া ও মানদণ্ড নির্ধারণে আলোচনা এখনও চলছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জোটে যোগদানের প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা একটি রোডম্যাপ তৈরির বিষয়েও কাজ করছি।’
চুক্তি কার্যকর করার উদ্যোগ
ইস্তানবুুলের বৈঠকে পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার, সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তুরস্কের প্রতিনিধি দলে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের ও চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ সেলচুক বায়রাকতারওলু।
অন্যদিকে সৌদি আরবের প্রতিনিধি দলে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান ও চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ ফাইয়াদ আল-রুওয়াইলি।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও তুরস্কের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ছিল তিন দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা বৃদ্ধি, যৌথ সামরিক মহড়া, যৌথ উৎপাদন-গবেষণাসহ প্রতিরক্ষাশিল্পে সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসবিরোধী সমন্বয়।
ইস্তানবুুলের ইবনে খালদুন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ গোকহান এরেলি বলেন, পাকিস্তান-সৌদি আরব-তুরস্কের এ সম্পর্ক যুদ্ধের কারণে নতুন করে তৈরি হয়নি। যুদ্ধ শুরুর আগেও এই তিন দেশের মধ্যে সম্পর্ক ও সহযোগিতা ছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি পাকিস্তান ও সৌদি আরবের কয়েক দশকের নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং কৌশলগতভাবে স্বনির্ভর হওয়ার জন্য তুরস্কের নিজস্ব প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। গোকহান এরেলি বলেন, জোটের প্রকৃত পরীক্ষা হবে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর।
আলজাজিরাকে গোকহান এরেলি বলেন, যদি যৌথ ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক সচিবালয় ও প্রতিরক্ষাশিল্পে যৌথ উদ্যোগ বর্তমান উত্তেজনার পর্ব শেষ হওয়ার পরও টিকে থাকে, তা হলে বোঝা যাবে, এ চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামোর মৌলিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে কাতার ইউনিভার্সিটির গালফ স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক সিনেম চেঙ্গিজ এ চুক্তির বিষয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে কেবল ‘প্রতীকী’ বা ‘বড় ধরনের পরিবর্তন আনার মতো’ হিসেবে বর্ণনা করার সঙ্গে তিনি পুরোপুরি একমত নন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি