যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সংঘাত কোনো পক্ষের জন্যই পরিষ্কার বিজয় এনে দিতে পারেনি এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থিতিশীল নতুন শক্তি ভারসাম্যও তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং যুদ্ধটি পুরো অঞ্চলে বিভাজন ও নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়েছে। ইরান, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, রাশিয়া এবং চীনসহ সব বড় শক্তিই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুদ্ধ শেষের দিকে একটি সমঝোতার আলোচনা শুরু হওয়ায় ধারণা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রকৃত অর্থে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও তারা কিছু সামরিক সাফল্য পেয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ শুরুর সময় ঘোষিত মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জিত হয়নি।
ইরানে সরকার পরিবর্তন ঘটেনি, বরং দেশটি আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণকে একটি শক্তিশালী কৌশলগত চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আবার মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় তার আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মনোযোগ ও সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে।
ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও সৌদি আরবসহ আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা পিছিয়ে গেছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় ইরানের হুমকি কমানোর লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, পুরো ঘটনাটিকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরাজয় হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ আড়াল হয়। প্রকৃতপক্ষে এই যুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রায় সব পক্ষই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং কেউই তাদের কাঙ্ক্ষিত কৌশলগত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
যুদ্ধটি নতুন কোনো স্থিতিশীল আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এটি বিদ্যমান বিভাজন আরও গভীর করেছে এবং পুরো অঞ্চলে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
ইরান সরকার পতন এড়াতে পারলেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির বিকল্প কৌশল সীমিত হয়েছে এবং পুনর্গঠনের সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, কিন্তু দর-কষাকষির ক্ষমতা কমে গেছে।
চীন ও রাশিয়া সরাসরি সামরিকভাবে ইরানকে সহায়তা না করায় স্পষ্ট হয়েছে যে তাদের সম্পর্ক মূলত কৌশলগত স্বার্থনির্ভর, পূর্ণাঙ্গ জোট নয়। ফলে ইরানকে এখন তুলনামূলক দুর্বল অবস্থান থেকে তাদের ওপর আরও নির্ভর করতে হচ্ছে।
অর্থনৈতিকভাবে যুদ্ধ ইরানের জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে— মুদ্রার অবমূল্যায়ন, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতের ক্ষতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ব্যাপক কর্মসংস্থান হ্রাসও দেশটির ইতিহাসে বড় অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
ফলে ইরানকে এখন একই সঙ্গে সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং গভীর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের ফলে দেশটির নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অভিজাতদের হাতে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সংস্কার ও জনমতের চাপ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও এই সংঘাতে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যুদ্ধ তাদের দীর্ঘদিনের আশঙ্কাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে, কারণ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি দেখিয়েছে, এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামো ভৌগোলিকভাবে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
যদিও তারা নিজেদের অর্থনীতিকে জ্বালানি নির্ভরতা থেকে সরানোর চেষ্টা করছে, এই যুদ্ধ সেই পরিকল্পনাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছত্রছায়ার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ওয়াশিংটনের প্রতি আস্থা আরও কমেছে।
রাশিয়া স্বল্পমেয়াদে তেলের দামের সুবিধা পেলেও মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব দুর্বল হয়েছে। ইউক্রেনসহ অন্যান্য সংঘাতে মনোযোগ সরানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে।
চীন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান নিলেও ইরানে বড় বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো শক্তিই এককভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সামরিক শক্তি থাকলেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। ফলে অঞ্চলটি এখনো অনিশ্চয়তা ও প্রতিযোগিতার মধ্যেই রয়ে গেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ