মর্ত্যলোকে অমরত্ব

আরমান মুকুল

খেলা

ফুটবল ইতিহাসে জয়ের জন্য আর কিছুই যেন বাকি নেই তার। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অর। সম্ভাব্য প্রায় শিরোপাই

2026-06-18T04:25:44+00:00
2026-06-18T05:34:44+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
খেলা
লিওনেল মেসি
মর্ত্যলোকে অমরত্ব
আরমান মুকুল
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৪:২৫ এএম  আপডেট: ১৮.০৬.২০২৬ ৫:৩৪ এএম  (ভিজিট : ১৬)
লিওনেল মেসি। ছবি : সংগৃহীত
ফুটবল ইতিহাসে জয়ের জন্য আর কিছুই যেন বাকি নেই তার। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অর। সম্ভাব্য প্রায় শিরোপাই বহু আগে নিজের করে নিয়েছেন লিওনেল মেসি। ব্যক্তিগত রেকর্ডের খাতাও সমৃদ্ধ হয়েছে অসংখ্য অর্জনে। এমন একজন ফুটবলারের কাছে হয়তো ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে আর নতুন কিছু পাওয়ার থাকে না। কিন্তু মেসি যেন সেই প্রচলিত ধারণাকে প্রতিনিয়ত ভুল প্রমাণ করে চলেছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক ছিল শুধু তিনটি গোলের গল্প নয়; এটি ছিল এক অনিঃশেষ ক্ষুধার গল্প। এমন এক ক্ষুধা, যা বয়স, অর্জন কিংবা সময়ের কাছে হার মানতে জানে না। বয়স ৩৮ পেরিয়েছে, আগামী ২৪ জুন ৩৯ বছরে পা দেবেন তিনি। এই বয়সে এসে যেখানে অধিকাংশ ফুটবলার অবসরের কথা ভাবেন, সেখানে মেসি খেলছেন নিজের রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। আর খেলছেন এমনভাবে, যেন ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ মঞ্চে নামা এক তরুণ ফুটবলার।

কানসাস সিটিতে তার প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি দৌড় এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে ফুটে উঠেছে সেই চিরচেনা জয়ের নেশা। স্কোরলাইন ১-০, ২-০ কিংবা ৩-০ কোনো অবস্থাতেই তাকে সন্তুষ্ট মনে হয়নি। বরং বল পেলেই আক্রমণে ছুটেছেন, সুযোগ তৈরি করেছেন, গোল খুঁজেছেন। হ্যাটট্রিক পূর্ণ করার পরও তার চোখে-মুখে ছিল আরও কিছু করার তাড়না। ঠিক এখানেই অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে ওঠেন মেসি।

ম্যাচের শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে আর্জেন্টিনা। ১৭ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে রদ্রিগো ডি পলের দুর্দান্ত পাস পেয়ে ডি বক্সের বাইরে থেকে দারুণ এক ফিনিশে দলকে এগিয়ে দেন মেসি। প্রথমার্ধে আরও কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও ব্যবধান আর বাড়াতে পারেনি লিওনেল স্কালোনির দল।

বিরতির পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। ৬০ মিনিটে আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারের নেওয়া শট আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান ফিরিয়ে দিলে সুযোগটি লুফে নিয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন মেসি। এরপর ৭৬ মিনিটে ব্যক্তিগত তৃতীয় গোল করে পূর্ণ করেন হ্যাটট্রিক। এই হ্যাট্রিকের সঙ্গে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা জার্মানির মিরোসøাভ ক্লোসার সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে ওঠেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ২০০তম ম্যাচটিও স্মরণীয় করে রাখেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।

ম্যাচজুড়ে বল দখল, আক্রমণ ও সুযোগ সৃষ্টিতে ছিল আর্জেন্টিনার স্পষ্ট আধিপত্য। অন্যদিকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আলজেরিয়া তেমন কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। পুরো ম্যাচে স্কালোনির দল মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগে ধারাবাহিকভাবে আধিপত্য বজায় রাখে, যার প্রতিফলনই দেখা যায় স্কোরলাইনে।

পরিসংখ্যানের ভাষায় তিনি ফুটবলের অন্যতম সেরা। কিন্তু তার প্রকৃত মহত্ত্ব লুকিয়ে আছে মানসিকতায়। এত অর্জনের পরও নিজেকে প্রতিদিন নতুন করে প্রমাণ করার তাগিদ খুব কম কিংবদন্তির মধ্যেই দেখা যায়। মেসির মধ্যে সেই বিরল বৈশিষ্ট্য আজও অটুট। হয়তো এ কারণেই তিনি শুধু একজন সফল ফুটবলার নন, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার নাম।

তবে এই বিশ্বকাপের মঞ্চে তার প্রত্যাবর্তনের গল্পটাও কম অনুপ্রেরণার নয়। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ইনজুরির কারণে কিছুদিন মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল মেসিকে। বয়সের এই পর্যায়ে চোট থেকে ফিরে আসা যে কতটা কঠিন, তা ভালোভাবেই জানেন তিনি। তবু পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতার জন্য। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তার প্রাণশক্তি, দৌড় আর তীক্ষèতা দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও তিনি ইনজুরির সঙ্গে লড়ছিলেন। বরং এই প্রত্যাবর্তন যেন আরও একবার প্রমাণ করেছে, মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি তার পা নয়, তার মানসিক দৃঢ়তা।

বয়সকে স্রেফ একটা সংখ্যা বানিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই রাজকীয় এক হ্যাটট্রিক উপহার দিয়েছেন মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের এই জাদুকরী জয়ের রাতে একগুচ্ছ রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তবে ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে এসে মেসি নিজেই ফাঁস করলেন তার এই চিরসবুজ ফর্ম আর অদম্য মানসিকতার পেছনের এক গোপন রহস্য- যার নাম ‘রাফায়েল নাদাল কানেকশন’।

এই জায়গাতেই তার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় টেনিস কিংবদন্তি রাফায়েল নাদালের। ক্যারিয়ারের শেষভাগে এসেও নাদাল যেমন প্রতিটি পয়েন্টের জন্য সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন, মেসিও তেমনি প্রতিটি ম্যাচে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অর্জনের পাহাড় গড়ার পরও তাদের ভেতরের প্রতিযোগী সত্তা কখনো মরে যায়নি। জয়ের ক্ষুধা, নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আর সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকার মানসিকতাই তাদের কিংবদন্তি বানিয়েছে। বারবার চোটে পড়ে ফিরে আসা নাদালের গল্পও মেসিকে অনুপ্রাণিত করে। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, একজন ক্রীড়াবিদের প্রকৃত পরিচয় শুধু সাফল্যে নয়, প্রতিকূলতা জয় করার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক করে মেসি আবারও মনে করিয়ে দিলেন, বয়স কেবলই একটি সংখ্যা। শরীর হয়তো সময়ের নিয়ম মেনে বদলায়, কিন্তু মহান ক্রীড়াবিদদের ভেতরের আগুন সহজে নিভে যায় না। বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মেসি যেন নতুন করে ঘোষণা দিলেন- তিনি এখনও শেষ হয়ে যাননি।

আর সেটিই হয়তো তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। রেকর্ড নয়, ট্রফি নয়, বরং অবিরাম ক্ষুধা- যে ক্ষুধা ৩৮ বছর বয়সেও তাকে ছুটিয়ে নিয়ে যায় নতুন ইতিহাসের সন্ধানে।

/আআ


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: