সংগ্রাম সাহসে গোলের গল্প

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরাকের প্রত্যাবর্তনের গল্পটি শেষ পর্যন্ত সুখকর হয়নি। আর্লিং হালান্ডের নেতৃত্বে নরওয়ের কাছে ৪-১ ব্যবধানে হারতে হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিকে।

2026-06-18T05:08:27+00:00
2026-06-18T05:34:12+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
খেলা
সংগ্রাম সাহসে গোলের গল্প
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৫:০৮ এএম  আপডেট: ১৮.০৬.২০২৬ ৫:৩৪ এএম  (ভিজিট : ১১)
আয়মান হুসেইন। ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরাকের প্রত্যাবর্তনের গল্পটি শেষ পর্যন্ত সুখকর হয়নি। আর্লিং হালান্ডের নেতৃত্বে নরওয়ের কাছে ৪-১ ব্যবধানে হারতে হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিকে। তবে পরাজয়ের রাতেও আলো কেড়েছেন একজন- আয়মান হুসেইন। বিশ্বকাপে ইরাকের হয়ে গোল করে ইতিহাসের পাতায় নাম তুলেছেন এই তারকা স্ট্রাইকার। অথচ আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথটা ছিল না মোটেও সহজ। যুদ্ধ, সহিংসতা, স্বজন হারানোর বেদনা এবং অনিশ্চয়তায় ভরা এক শৈশব পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

৪০ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেই কঠিন প্রতিপক্ষ নরওয়ের মুখোমুখি হয়েছিল ইরাক। ম্যাচের ২৯ মিনিটে আর্লিং হালান্ডের গোলে পিছিয়ে পড়ে তারা। তবে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই জবাব দেন আয়মান হোসেন। দুর্দান্ত এক হেডে সমতায় ফেরান দলকে। যদিও শেষ পর্যন্ত নরওয়ের আক্রমণ সামলাতে পারেনি ইরাক। আরও তিন গোল হজম করে ৪-১ ব্যবধানে হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাদের। তবু বিশ্বকাপে ইরাকের প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে গোলদাতা হিসেবে আয়মানের নাম ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে।

এই অর্জনের পেছনে রয়েছে এক হৃদয়বিদারক জীবন সংগ্রামের গল্প। ২০০৮ সালে যখন আয়মানের বয়স মাত্র ১২ বছর, তখন তার পরিবারে নেমে আসে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। বাড়ি নির্মাণের সামগ্রী কিনতে যাওয়ার পথে আল-কায়েদা জঙ্গিদের গুলিতে নিহত হন তার বাবা। পেশায় তিনি ছিলেন ইরাকি সেনাবাহিনীর সদস্য। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাদের।

এর কয়েক বছর পর আরেকটি আঘাত আসে পরিবারে। ইরাকজুড়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যে অপহৃত হন আয়মানের বড় ভাই। এরপর আর কখনো তার খোঁজ মেলেনি। একের পর এক এই বিপর্যয় কিশোর আয়মানকে এমন অবস্থায় ঠেলে দেয় যে, পরিবারের দায়িত্ব নিতে ফুটবলই ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।

সেই কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে এক সাক্ষাৎকারে আয়মান বলেছিলেন, ‘পরিবারের দেখাশোনা করার লক্ষ্যে আমি ফুটবল খেলা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু মা রাজি হননি।’ বরং ছেলেকে নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটতে উৎসাহ দিয়েছিলেন তার মা। মায়ের সেই সমর্থনই পরবর্তীতে তাকে দেশের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার পথে এগিয়ে দেয়।

শুধু বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন পূরণই নয়, ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবারের মতো ইরাককে বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরিয়ে আনতেও বড় ভূমিকা রেখেছেন আয়মান। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে ধারাবাহিক পারফর্মার। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ১২টি গোল করে দেশের ঐতিহাসিক অভিযানের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি।

তবে বিশ্বকাপে অংশ নিতে এসেও আরেকটি অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে এই ৩০ বছর বয়সি ফরোয়ার্ডকে। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে অংশ নিতে গিয়ে শিকাগো বিমানবন্দরে প্রায় সাত ঘণ্টা আটকে রাখা হয় তাকে। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি পেলেও একই সুযোগ পাননি ইরাক দলের ফটোগ্রাফার তালাল সালাহ। অনুমতি না মেলায় তাকে ফিরে যেতে হয়েছে নিজ দেশে।

২০১৫ সালে ইরাক জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক হয় আয়মান হোসেনের। সে সময়ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা সংকটে জর্জরিত ছিল দেশটি। এমন পরিস্থিতিতে ফুটবলই সাধারণ মানুষের জন্য সাময়িক স্বস্তি ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেই সময় থেকেই জাতীয় দলের অন্যতম নির্ভরতার নাম হয়ে ওঠেন আয়মান।

নিজের শক্তিশালী হেড, বক্সের ভেতরে নিখুঁত ফিনিশিং এবং গোল করার সহজাত ক্ষমতার জন্য পরিচিত তিনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজেকে নিয়ে গেছেন ভিন্ন উচ্চতায়। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তার গোলগুলোই শেষ পর্যন্ত ইরাককে বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপের টিকেট এনে দেয়।

নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে একদিকে যেমন দলের একমাত্র গোলটি করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন, অন্যদিকে শেষদিকে আত্মঘাতী গোলের দুর্ভাগ্যও সঙ্গী হয়েছে তার। তবে সেই ভুল তার সামগ্রিক পারফরম্যান্সকে মøান করতে পারেনি। বরং ম্যাচ শেষে তাকে ভূয়সী প্রশংসায় ভাসিয়েছেন ইরাকের কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড। তিনি বলেন, ‘সে এমন একজন খেলোয়াড়, যাকে বক্সের ভেতরে নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। 

আমি তার জন্য খুবই খুশি ও গর্বিত। মৌসুমে তার বেশ কিছু চোট ছিল। এরপরও এত শক্তি নিয়ে ৯০ মিনিট খেলা এবং গোল করা অসাধারণ ব্যাপার।’

স্কোরবোর্ডে এটি হয়তো ইরাকের জন্য একটি হতাশার পরাজয়। কিন্তু আয়মান হোসেনের ব্যক্তিগত গল্পে এটি আরেকটি অনুপ্রেরণার অধ্যায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত শৈশব, স্বজন হারানোর বেদনা এবং জীবনের অসংখ্য প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল করার স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি। আর সেই কারণেই পরাজয়ের রাতেও ইরাকের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হয়ে রয়েছেন আয়মান হোসেন।

/আআ


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: