জীবনের কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো শুধু বলা যায় না, অনুভব করতে হয়। কিছু দৃশ্য থেকে যায় স্মৃতির অ্যালবামে। ফুটবল বিশ্বকাপে একটি ম্যাচের নয়, একটি প্রজন্মের গল্প হয়ে যায়। বুধবার রাজধানী ঢাকার সকালে অন্য দিনের মতোই শহর জেগে উঠে। কিন্তু কোথাও যেন ছিল একটা অপেক্ষা।
সকাল সাড়ে ৬টা, কিন্তু অন্যদিনের চেয়ে ঢাকার রাস্তা সুনসান, নীরব। আমার প্রথম ও তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া দুই মেয়েও আর্জেন্টাইন সাপোর্টার। তাই স্কুলে যাবে না, খেলা দেখবে। বললাম, ‘পরীক্ষা স্কুলে যাও। এসে খেলা দেখতে পারবে’। বুঝিয়ে শুনিয়ে স্কুলে নিয়ে গিয়ে দেখি শিক্ষার্থী উপস্থিতি খুব কম। পাশের দোকান থেকে টিফিন কেনার সময় দোকানদার সালাম দিয়ে বললেন, আজ অনেকেই স্কুলে আসেনি। সবাই খেলা দেখছে। এরমধ্যে মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠল। অল্প সময়ে ম্যাচ শুরু হবে। ওদের স্কুলে দিয়েই তড়িঘড়ি বাসায় ফিরে টিভি সেটের সামনে বসলাম।
আর্জেন্টিনা বনাম আলজেরিয়া ম্যাচটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না; এটি ছিল লিওনেল মেসি, এক কিংবদন্তির অমরত্বের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়াম যখন সত্তর হাজার দর্শকের গর্জনে কাঁপছিল, তখন হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশে আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের উল্লাস জানিয়ে দিচ্ছিল পৃথিবীটা এখনও মেসিরই।
মেসির হ্যাটট্রিকের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি পরিণত হয় ছোট্ট এক আর্জেন্টিনায়। নীল-সাদা জার্সি, পতাকা, স্লোগান আর উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনিতে কেঁপে ওঠে চারপাশ। ৩০০ ফিট এলাকাতেও একই চিত্র। বিশাল পতাকা, ব্যানার, জার্সি পরে সমর্থকদের আনন্দ মিছিল। আর টেলিভিশনের সামনে তখন লাখো বাংলাদেশি। কেউ অফিস যাওয়ার প্রস্তুতি বাদ দিয়েছেন, কেউ রাত জেগেছেন, কেউ আবার ভোরে উঠে বসেছেন প্রিয় দলের জার্সি পরে। বাংলাদেশে ফুটবল মানে শুধু খেলা নয়, এটি আবেগের আরেক নাম। আর সেই আবেগের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছেন মেসি।
৩৮ বছরের এক মানুষ আবারও প্রমাণ করলেন, গ্রেটদের কোনো মেয়াদ থাকে না। তিনি যখন শান্তভাবে মাঠ ছেড়ে হাঁটছিলেন, তখন পুরো ফুটবল বিশ্ব যেন দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানাচ্ছিল তাদের রাজাকে। বিখ্যাত ছোটগল্প ‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’ এর লেখক পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী আমেরিকান সাহিত্যিক মার্জরি কিনান রলিংস এই হৃদয়স্পর্শী গল্পটি মূলত তার নিজের জীবনের এক বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখেন। সেখানে লেখকের বিখ্যাত একটি উক্তি করেছিলেন, ‘সাইজ ডোন্ট ম্যাটার।’ তেমনি মেসিকে নিয়ে বলাই যায়, ‘এইজ ডোন্ট ম্যাটার ফর মেসি’।
খেলার শেষ বাঁশি বাজার পর আফসোস হলো মেয়েদের স্কুলে পাঠানোয়। মনে হলো হয়তো সেই স্কুল ফাঁকি দেওয়া শিশুরাই সবচেয়ে ভাগ্যবান। কারণ তারা নিজের চোখে দেখেছে মেসির সেই জাদু, যা বড়রাও শুধু স্মৃতিতে ধরে রাখতে চায়।
আর্জেন্টিনা বনাম আলজেরিয়া বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ। কিন্তু মাঠের বাইরে এটি হয়ে উঠেছিল আবেগ, ইতিহাস আর ভালোবাসার মহোৎসব। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আয়োজন, সবচেয়ে বেশি দল নিয়ে শুরু হওয়া এই আসরে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে মাঠে নামে আর্জেন্টিনা। লক্ষ্য একটাই শিরোপা ধরে রাখা। আর সেই যাত্রার কেন্দ্রে একজনই লিওনেল মেসি। মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাস গড়েন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। টানা ৬টি বিশ্বকাপ খেলা প্রথম ফুটবলার হিসেবে নাম লেখান রেকর্ড বইয়ে। বয়স ৩৮ বছর। প্রশ্ন ছিল আগের মতো কি পারবেন? পায়ের সেই জাদু কি এখনও আছে? নাকি তিনি শুধু স্মৃতির নায়ক?
৪৫ মিনিটের মধ্যেই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলেন মেসি। কানসাস সিটি হয়ে উঠল এক টুকরো আর্জেন্টিনা। ম্যাচের শুরুতেই বোঝা যাচ্ছিল, আজকের মেসি অন্য রকম। নিজের অর্ধে নেমে বল কাড়া, ডিফেন্ডারদের চাপ দেওয়া- সব মিলিয়ে যেন পুরোনো দিনের মেসির ছায়া। পঞ্চম মিনিটে গোল করেও অফসাইডে বাতিল হয়। কিন্তু অপেক্ষা বেশিক্ষণ নয়।
১৭ মিনিটে এলো সেই মুহূর্ত। রদ্রিগো দি পলের পাস থেকে বল পেয়ে প্রায় ৪০ গজ দূর থেকে এগিয়ে গেলেন মেসি। তিন টাচ। তারপর বাঁ পায়ের শট। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান হাত লাগিয়েও ঠেকাতে পারলেন না। দ্বিতীয় গোল আসে দ্বিতীয়ার্ধে। আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শট থেকে ফিরে আসা বলে সবচেয়ে আগে পৌঁছে যান মেসি।
গোলরক্ষকের ভুলের সুযোগ নিতে ভুল করেননি তিনি। তৃতীয় গোলটি ছিল নিখাদ মেসি। ৭৬ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে তিন ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে নিচের কোণে বল পাঠালেন। মুহূর্তেই ইতিহাস। বিশ্বকাপে মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক। এই তিন গোল শুধু একটি জয় নয়, নতুন কিছু রেকর্ডের জন্ম। বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় তিনি উঠে আসেন মিরোসøাভ ক্লোসার পাশে।
গার্ড মুলার ও রোনালদো নাজারিওর মতো কিংবদন্তিদের পেছনে ফেলে নতুন উচ্চতায় পৌঁছান তিনি। ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করে সবচেয়ে বেশি বয়সি হ্যাটট্রিককারী ফুটবলারও হন মেসি। এর আগে এই রেকর্ড ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর। পাঁচটি বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তিতেও মেসি দাঁড়িয়ে গেলেন রোনালদোর পাশে।
ম্যাচের প্রথম গোলের পর মেসির চোখে পানি দেখা গিয়েছিল। ভক্তরা ভেবেছিলেন এটি হয়তো আনন্দের অশ্রু। তবে ম্যাচ শেষে মেসি নিজেই পরিষ্কার করেছেন বিষয়টি। তিনি জানান, ব্যক্তিগত কিছু কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি এবং দলের সমর্থনই তাকে শক্তি জুগিয়েছে। আবেগপ্রবণ ছিলেন কোচ লিওনেল স্কালোনিও।
৮০ মিনিটে যখন মেসিকে তুলে নিয়ে নিকো পাজকে নামানো হলো, তখন ডাগআউটে স্কালোনি তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খান। পরে সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি বলেন, ‘আমি তাকে বলেছি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। সে যেদিন চলে যাবে, আমরা তাকে মিস করব। তাই যতক্ষণ আছে, উপভোগ করি।
/আআ