কখনো কখনো ফুটবল শুধু একটি খেলা থাকে না, হয়ে ওঠে আবেগের এমন এক মহাকাব্য, যেখানে শব্দ হারিয়ে যায়, চোখ ভিজে ওঠে, আর সময় যেন কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়ায়। কানসাসের রাতটি ছিল ঠিক তেমনই। ৩৮ বছর বয়সি লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে একের পর এক জাদুকরী স্পর্শে হ্যাটট্রিক করে যখন আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলের জয় উপহার দিচ্ছিলেন, তখন গ্যালারি মুগ্ধতায় স্তব্ধ, প্রতিপক্ষ অসহায়, আর ডাগআউটে দাঁড়িয়ে চোখের জল লুকাতে পারছিলেন না কোচ লিওনেল স্কালোনি।
কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের রাতেও যিনি এতটা আবেগ দেখাননি, সেই স্কালোনির অশ্রুই যেন বলে দিল, মেসি আর কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি এক প্রজন্মের অনুভূতি, এক জাতির স্বপ্ন, আর ফুটবল নামের শিল্পের সবচেয়ে উজ্জ্বল কবিতা, ফুটবল এখনও তারই ভাষায় কথা বলে।
ম্যাচ শেষে স্কালোনি বলেন, ‘আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। আমি তাকে জড়িয়ে ধরেছি, চুমু খেয়েছি, তারপর বলেছি, তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আমি জানি না, এর বাইরে কী বলব।’ কোচের এই একটি মন্তব্যই যেন মেসিকে ব্যাখ্যা করে। কারণ তিনি কেবল গোল করেন না, মানুষের অনুভূতিকেও স্পর্শ করেন।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির হ্যাটট্রিককে শুধুই তিনটি গোলের পরিসংখ্যানে মাপা যাবে না। পুরো ম্যাচজুড়ে তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্র, ছন্দের নির্মাতা এবং প্রতিপক্ষের জন্য অবিরাম আতঙ্কের নাম। তিনি কখনো মাঝমাঠে নেমে এসে বল নিয়েছেন, কখনো দুই ডিফেন্ডারের মাঝখানে জায়গা বের করেছেন, আবার কখনো বক্সের কিনারায় দাঁড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের গতি বদলে দিয়েছেন। তার প্রতিটি স্পর্শে ছিল আত্মবিশ্বাস, প্রতিটি সিদ্ধান্তে ছিল অভিজ্ঞতার ছাপ এবং প্রতিটি আক্রমণে ছিল এক ধরনের নির্মম কার্যকারিতা।
আলজেরিয়া জানত, তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মেসি। তাকে থামাতে বিশেষ পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের সমস্যা হলো, তাদের থামানোর পরিকল্পনা প্রায়ই কাগজেই আটকে যায়। মেসিকে ঘিরে যত আলোচনা, তার বড় একটি অংশ জুড়ে থাকে রেকর্ড।
কিন্তু সতীর্থ রদ্রিগো ডি পলের মতে, ব্যক্তিগত অর্জনের প্রতি মেসির কোনো মোহ নেই। মেসির পারফরম্যান্সে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছেন সতীর্থ আলেক্সিস মাক আলিস্তের। ম্যাচ শেষে তার কণ্ঠেও ছিল বিস্ময়, ‘এটা বর্ণনা করার কোনো শব্দ নেই। আমি মনে করি, কেউ যদি ভেবে থাকে যে লিওকে ছাড়া এই দল ভালো, আজ এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, লিও অন্য সবার চেয়ে এই দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। আর তাকে ঘিরে আমাদের দল গড়ে তুলতে হবে, যেখানে তিনি স্বস্তিবোধ করবেন।’
মাক আলিস্তেরের এই মন্তব্য আর্জেন্টিনার বর্তমান বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে। কাতার বিশ্বকাপ জয়, দুটি কোপা আমেরিকার সাফল্য এবং সাম্প্রতিক দাপুটে পারফরম্যান্সের পেছনে এখনও সবচেয়ে বড় প্রেরণার নাম লিওনেল মেসি। মেসির অনবদ্য রাতের সাক্ষী ছিলেন তার স্ত্রী আন্তোনেল্লা রোকুজ্জোও। কানসাস সিটির স্টেডিয়ামে বসে তিনি উপভোগ করেছেন স্বামীর শ্রেষ্ঠত্বের আরেকটি অধ্যায়। ম্যাচ শেষে আবেগ সামলাতে না পেরে ইনস্টাগ্রামে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা সব সময় তোমার পাশে আছি, মেসি। তুমি অসাধারণ।’ এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে মেসির ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস।
কাতারে বিশ্বকাপ জিতে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এরপর দুটি কোপা আমেরিকা জিতে সাফল্যের সোনালি সময় পার করছে আলবিসেলেস্তেরা। এবারও লক্ষ্য একটাই, শিরোপা ধরে রাখা। ডি পল বলেন, ‘আমরা এখানে এসেছি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে, নিজেদের উন্নতি অব্যাহত রাখতে। আমাদের লক্ষ্য সবসময় এটাই থাকে যেন আমরা টুর্নামেন্টের শুরু থেকে একদম শেষদিন পর্যন্ত টিকে থাকি। ফুটবলে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে, তবে আমাদের নিজস্ব স্বকীয়তা এবং যে মূল্যবোধগুলো আমরা লালন করি, সেগুলোর প্রতি সবসময় শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে।’
কানসাসের ম্যাচ শেষে আবারও প্রমাণিত হলো, লিওনেল মেসি কেবল একজন ফুটবলার নন; তিনি এক অনুভূতির নাম। তার একটি হ্যাটট্রিক একজন কোচকে কাঁদাতে পারে, প্রতিপক্ষকে অসহায় করে দিতে পারে, সতীর্থকে বাকরুদ্ধ করে দিতে পারে এবং কোটি সমর্থকের হৃদয়ে নতুন স্বপ্ন জাগিয়ে তুলতে পারে। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই মেসি যেন ঘোষণা দিয়ে রাখলেন, গল্পটা এখনও শেষ হয়নি। ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলোর একটি হয়তো এখনও লেখা বাকি।
/আআ