যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধাবসানের লক্ষ্যে অবশেষে চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে বহুল আলোচিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইতিমধ্যে চুক্তিটিতে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর করা হয়েছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সামনে এই সমঝোতা স্মারকের মূল ১৪টি দফা পাঠ করে শোনান। উভয়পক্ষ থেকে এখনো এর কোনো আনুষ্ঠানিক অনুলিপি প্রকাশ না করা হলেও, মার্কিন কর্মকর্তার দেওয়া বিবরণী থেকে চুক্তির যে বিস্তারিত রূপরেখা পাওয়া গেছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সামরিক অভিযান ও যুদ্ধাবসান: যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং এই যুদ্ধে লিপ্ত তাদের সহযোগী পক্ষগুলো অবিলম্বে সব ফ্রন্টে (লেবাননসহ) সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘোষণা দিচ্ছে। কোনো পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ বা বলপ্রয়োগের হুমকি দিতে পারবে না। লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার বিষয়টি এতে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে।
২. সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পর পরস্পরের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে। একই সঙ্গে কোনো পক্ষই অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
৩. চূড়ান্ত চুক্তির সময়সীমা: উভয় দেশ আগামী সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে দুই পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময়সীমা প্রয়োজনে আরও বাড়ানো যেতে পারে।
৪. মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার: চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ-অবরোধ ও যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু করবে এবং আগামী ৩০ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণ শেষ করবে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে ওই অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হবে।
৫. হরমুজ প্রণালী ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল: ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ ও শুল্কমুক্ত চলাচলের জন্য আগামী ৬০ দিন সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যুদ্ধকালীন মাইন ও কারিগরি জটিলতা দূর করে ৩০ দিনের মধ্যে এই জলপথ পুরোপুরি সচল করা হবে। ওমান ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে আলোচনা করে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করবে তেহরান।
৬. ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল: ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) মার্কিন ডলারের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করবে যুক্তরাষ্ট্র। ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে এই তহবিলের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে।
৭. নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইইএ) বোর্ড অব গভর্নরস-এর প্রস্তাবনাসহ ইরানের ওপর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের একতরফা (প্রাথমিক ও মাধ্যমিক) নিষেধাজ্ঞা একটি নির্দিষ্ট সময়সূচী অনুযায়ী পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে।
৮. পারমাণবিক কর্মসূচি ও সমৃদ্ধকরণ: ইরান পুনরুল্লেখ করেছে যে, তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। ইরানের মজুতকৃত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (আইএইএ)-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে অন-সাইট ডাউন-ব্লেন্ডিং (মান কমিয়ে ফেলা) করার বিষয়ে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী ইরানের পারমাণবিক প্রয়োজনের বিষয়টি পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে।
৯. স্থিতাবস্থা বজায় রাখা: চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত দুই পক্ষই বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখবে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থানের কোনো পরিবর্তন করবে না, বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না এবং ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত কোনো সৈন্য মোতায়েন বা বৃদ্ধি করবে না।
১০. জ্বালানি রপ্তানিতে মার্কিন ছাড়: সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রপ্তানি এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা ও পরিবহনের ওপর অবিলম্বে বিশেষ ছাড় বা ওয়েভার জারি করবে।
১১. ফ্রিজ হওয়া অর্থ ও সম্পদ মুক্তি: যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের সব ধরনের তহবিল ও সম্পদ অবমুক্ত করা হবে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত যেকোনো সুবিধাভোগী যাতে এই অর্থ সম্পূর্ণ ব্যবহার করতে পারেন, সে লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সব আইনি অনুমতি ও লাইসেন্স ইস্যু করবে।
১২. যৌথ পর্যবেক্ষণ সেল গঠন: এই সমঝোতা স্মারকের সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তির শর্তাবলি উভয় পক্ষ সঠিকভাবে মেনে চলছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের নির্বাহী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বা মেকানিজম প্রতিষ্ঠা করা হবে।
১৩. সুনির্দিষ্ট দফায় আলোচনা শুরু: চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১, ৪, ৫, ১০ এবং ১১ নম্বর দফার সফল বাস্তবায়ন শুরু হওয়া সাপেক্ষে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে বাকি দফাগুলো নিয়ে একচেটিয়া আলোচনা শুরু করবে।
১৪. জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন: উভয় পক্ষের মধ্যকার এই চূড়ান্ত চুক্তিটি পরবর্তীতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত ও সমর্থিত হবে।
সময়ের আলো/কহু