যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধের কাছে ইরান আত্মসমর্পণ করবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করে তা ব্যর্থ করে দিতে ইরান সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত।
মঙ্গলবার দেওয়া বক্তব্যে পেজেশকিয়ান বলেন, সরাসরি সামরিক উপায়ে ইরানকে পরাজিত বা বশীভূত করা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে শত্রুরা এখন সামাজিক সমস্যা ও অর্থনৈতিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ‘আমার এবং রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের পুরো প্রচেষ্টা ঐক্য ও সংহতি ধরে রাখা।’
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অন্যতম প্রধান কৌশল। তবে এ চাপের কাছে নতি স্বীকার করার কোনো প্রশ্নই নেই।
তিনি বলেন, ‘আমরা কি সমস্যার কাছে হার মেনে আত্মসমর্পণ করব? অবশ্যই না।’
দেশ ও অঞ্চল পুনর্গঠনে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, প্রত্যেকেই পরিস্থিতি মোকাবিলার পথ খুঁজে বের করবে।
তিনি আরও বলেন, শত্রুরা হিসাব করেছিল জানুয়ারিতে দাঙ্গা উসকে দিয়ে এবং এর কয়েক দিনের মধ্যেই বড় ধরনের সামরিক হামলা চালিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানো সম্ভব হবে। কিন্তু ইরানি সমাজের গভীর ঐক্য ও সংহতির কারণে সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
সামাজিক উত্তেজনা মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে পেজেশকিয়ান এলিট, শিক্ষাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। সামাজিক সংকট ও ক্ষতিকর প্রবণতা মোকাবিলায় ন্যায়সংগত ও সমতাভিত্তিক আচরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সম্প্রতি কূটনৈতিক অগ্রগতির অংশ হিসেবে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সিদ্ধান্তের পক্ষেও সাফাই দেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এবং সরকারের তিন অঙ্গের প্রধানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ভিত্তিতেই এই সমঝোতা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সিদ্ধান্তটি ছিল সম্মিলিত প্রজ্ঞা, ব্যাপক আলোচনা এবং জাতীয় মর্যাদা ও স্বার্থের নীতির ওপর ভিত্তি করে নেওয়া।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘কেউ আত্মসমর্পণ করেনি। কারণ আমরা সবাই সফলভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেছি এবং বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক শক্তির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছি।’
সমঝোতা নিয়ে সমালোচনাকারীদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ভয় বা আত্মসমর্পণের কারণে ওই চুক্তি করা হয়নি। বরং যুক্তি, কৌশলগত সচেতনতা এবং জটিল ভূরাজনৈতিক সংকট সফলভাবে মোকাবিলার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই অভিযানে ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি এবং কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হন বলে ইরান দাবি করেছে।
এর জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ৪০ দিনে ১০০ দফা পাল্টা হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে।
পরে ১৭ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরান সামরিক অভিযান বন্ধের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক ঘোষণা করে। এতে বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয় ছিল।
তবে ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার সব শর্ত লঙ্ঘন করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তেহরান কঠোর জবাব দেয়।
এরই মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে ওই অভিযানের আওতায় ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা দেশ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
তেহরান এসব পদক্ষেপকে অবৈধ ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সময়ের আলো/কেএইচ