কবি শামসুর রাহমানের স্মৃতিঘেরা মসজিদে একদিন

শাব্বির আহমাদ খান

ফিচার

ইট-পাথরের ব্যস্ত শহরে জীবন মাঝেমধ্যেই একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। প্রতিদিন একই চেনা রাস্তায় হাঁটা, দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকা, কাজ

2026-06-18T18:04:12+00:00
2026-06-18T18:47:58+00:00
 
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
ফিচার
কবি শামসুর রাহমানের স্মৃতিঘেরা মসজিদে একদিন
শাব্বির আহমাদ খান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৬:০৪ পিএম  আপডেট: ১৮.০৬.২০২৬ ৬:৪৭ পিএম
মসজিদের পকুরপাড়ে বসেই কবি রচনা করেন তার কালজয়ী কবিতা। গ্রাফিক : সময়ের আলো
ইট-পাথরের ব্যস্ত শহরে জীবন মাঝেমধ্যেই একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। প্রতিদিন একই চেনা রাস্তায় হাঁটা, দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকা, কাজ কিংবা পড়াশোনার তাগিদে অবিরাম ছুটে চলা, সব মিলিয়ে জীবন যেন অদৃশ্য বৃত্তে ঘুরপাক খেতে থাকে। তখন মন খুঁজে ফেরে একটু প্রশান্তির স্পর্শ। শ্যামল ছায়া, গ্রামের মাটির গন্ধ, পুরোনো ঐতিহ্যের নিঃশব্দ উপস্থিতির কাছে যেতে ইচ্ছে করে। সেই ইচ্ছের টানেই কবি শামসুর রাহমানের স্মৃতিঘেরা মসজিদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম একদিন।

আজও যেন পাড়াতলীতে কবির উপস্থিতির সুবাস পাওয়া যায়।

আজও যেন পাড়াতলীতে কবির উপস্থিতির সুবাস পাওয়া যায়।


ডেমরা থেকে বাসে চড়ে বসলাম। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে নরসিংদীর পথে ক্রমশ এগিয়ে গেলে, ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্য। ইট-পাথরের বদলে দেখা মেলে সবুজ, শব্দের বদলে নীরবতা। ২ ঘণ্টা লাগল কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীর দক্ষিণ তীরে সবুজে ঘেরা এক শান্ত গ্রাম ‘পাড়াতলী’। এই গ্রামেই আছে বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র কবি শামসুর রাহমানের পৈতৃক ভিটা।

কবির স্মৃতিঘেরা মসজিদ।

কবির স্মৃতিঘেরা মসজিদ।


কবি তার ‘প্রিয় স্বাধীনতা’ কবিতায় লিখেছিলেন-

“মেঘনা নদী দেব পাড়ি
কল-অলা এক নায়ে।
আবার আমি যাব আমার
পাড়াতলী গাঁয়ে।

গাছ-ঘেরা ঐ পুকুরপাড়ে
বসব বিকাল বেলা।
দু-চোখ ভরে দেখব কত
আলো-ছায়ার খেলা।”

মসজিদের একাংশ।

মসজিদের একাংশ।


পাড়াতলীর মাটির সঙ্গে কবির ছিল গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক। সেই টানেই তিনি বারবার ফিরে এসেছেন এখানে। গ্রামের অলিগলি, পুকুরপাড়, আমগাছের ছায়া- সবখানেই ছড়িয়ে আছে কবির স্মৃতিচিহ্ন। কবির পৈতৃক ভিটার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ, যেটি সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। অথচ একসময় এই মসজিদের সামনের পুকুরপাড় ও আমগাছই ছিল কবির নীরব সঙ্গী। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে এই মসজিদের পকুরপাড়ে বসেই কবি রচনা করেন তার কালজয়ী কবিতা, 'স্বাধীনতা তুমি' এবং 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা'। যেন সেই মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমগাছের ছায়া, পুকুরের নিঃশব্দ জল, সব মিলেই ধারণ করেছিল সে সময়ের বেদনা, আশা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। 

মসজিদের সামনের পুকুর, যেখানে বসে কবি লিখেছেন একাধিক কবিতা।

মসজিদের সামনের পুকুর, যেখানে বসে কবি লিখেছেন একাধিক কবিতা।


মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখ আটকে যায় দৃষ্টিনন্দন মিম্বরের কারুকার্যে। খিলান আকৃতির নকশাটি দূর থেকেই আকর্ষণ করে চোখকে। নীল, লাল ও সাদা রঙের ব্যবহার পুরো কাঠামোকে দিয়েছে এক অনন্য পরিচয়। কোথাও অতিরিক্ত জাঁকজমক নেই, আবার কোথাও কমতিও নেই- সবকিছুই পরিমিত, ভারসাম্যপূর্ণ। খিলানের ভেতরে পাপড়ির মতো সূক্ষ্ম নকশা ও চারপাশের অলংকরণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কারিগরি দক্ষতা ও স্থাপত্যবোধ। দেয়ালের গায়ে দেখা যায় ইসলামি জ্যামিতিক ও অলংকারধর্মী নকশার সরল রূপ। মেঝেতে বিছানো লাল জায়নামাজ কেবলার দিকে শৃঙ্খলিত কাতার তৈরি করে, যা ভেতরের আবহকে আরও গম্ভীর ও একাগ্র করে তোলে। এই মসজিদ হয়ত বিশাল ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে না, কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপত্যের উদাহরণও নয়। কিন্তু মসজিদটির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তার সরলতায়। সীমিত উপকরণ দিয়েও যে এত সুন্দর স্থাপনা তৈরি করা যায়, তা কাছ থেকে না দেখলে বোঝা যায় না। সব মিলিয়ে এই মসজিদ যেন এক নিঃশব্দ বার্তা বহন করে- সৌন্দর্য মানে আড়ম্বর নয়, বরং শান্তি, শৃঙ্খলা ও আত্মিক প্রশান্তির এক গভীর অনুভব।

ওজুর স্থান।

ওজুর স্থান।


আরও যা দেখতে পারেন
কবি শামসুর রহমানের পৈতৃক ভিটা ঘুরে দেখার পাশাপাশি, কম খরচে আশপাশের বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থানও ঘুরে দেখতে পারেন। রায়পুরার পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা মেঘনা নদীর পাড়ে দাঁড়ালে চোখে ভাসে বিস্তীর্ণ জলরাশি। জলরাশির বুক চিড়ে সাঁতরে চলা ছোট-বড় নৌকো- ভ্রমণপিপাসুদের মনে আনন্দের শিহরণ ছড়ায়। কাছেই সাহারখোলা নদীর ঘাট। নিরিবিলি-শান্ত এই ঘাটে নদী-গ্রাম-প্রকৃতি সব যেন মিলেমিশে একাকার! আরও আছে চিনাদী বিল। সবুজের চাদর জড়ানো পরিবেশ-প্রকৃতি ও পাখির কোলাহলে মুখরিত এই জলাভূমি। 


ইতিহাস যাদের হৃদয়ের খোরাক, তাদের জন্য রয়েছে ‘ওয়ারী-বটেশ্বর’। আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন এই প্রত্নস্থল বাংলা-সভ্যতার গোড়ার ইতিহাস আগলে রেখেছে। এখানকার প্রাচীন নগর-সংস্কৃতির নিদর্শন আজও শোনায় সুদূর অতীতের গল্প।  

ধর্মীয় ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে বেলাল মসজিদও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে যুগ যুগ ধরে। মুঘল সময়ের স্থাপনাশৈলীর ছোঁয়ায় নির্মিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ তার নান্দনিক গঠন ও প্রাচীন ঐতিহ্যের জন্য বিশেষ পরিচিত। 

যেভাবে যাবেন পাড়াতলী
ঢাকা বা দেশের যেকোনও জেলা থেকে প্রথমে ট্রেন বা বাসযোগে নরসিংদী জেলা সদরে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে অটোরিকশায় রায়পুরা উপজেলা সদরে যেতে হবে। রায়পুরা বাজারে পৌঁছে নৌকায় মেঘনা নদী পাড় হতে হবে। নদী পাড় হয়ে অন্য পাড়ে অবস্থিত পাড়াতলী গ্রামে পৌঁছালে- কবির পৈতৃক ভিটা, স্মৃতিবিজড়িত পুকুর, মসজিদ এবং আমগাছগুলো ঘুরে দেখা যাবে। ঢাকা থেকে এখানে ঘুরতে গেলে যাওয়া-আসাসহ খরচ হবে ৪০০-৫০০ টাকা।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   কবি  শামসুর রাহমান  স্মৃতি  মসজিদ  নরসিংদী  পাড়াতলী  পৈতৃক ভিটে 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: