২০২৬ হতে পারে যেসব খেলোয়াড়ের শেষ বিশ্বকাপ

বন্যা নাসরিন

ফিচার

বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে এক তীব্র আবেগের নাম ‘বিশ্বকাপ’। এ আবেগ শুধু খেলার প্রতি নয়, খেলোয়াড়দের জন্যেও ভীষণভাবে কাজ

2026-06-18T18:16:52+00:00
2026-06-20T13:29:14+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
ফিচার
২০২৬ হতে পারে যেসব খেলোয়াড়ের শেষ বিশ্বকাপ
বন্যা নাসরিন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৬:১৬ পিএম  আপডেট: ২০.০৬.২০২৬ ১:২৯ পিএম
গত ২ দশকের সবচেয়ে বড় কয়েকজন তারকার হয়ত এটাই শেষ বিশ্বকাপ। গ্রাফিক : সমেয়র আলো
বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে এক তীব্র আবেগের নাম ‘বিশ্বকাপ’। এ আবেগ শুধু খেলার প্রতি নয়, খেলোয়াড়দের জন্যেও ভীষণভাবে কাজ করে। তারা হয়ে ওঠেন অনেকের জীবনের ‘নায়ক’। প্রতি চার বছর পর পর বিশ্বকাপ আসে, নতুন নায়ক তৈরি করে, আবার পুরোনো নায়কদের বিদায়ও জানায়। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের আসরে হয়ত শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে দেখা যাবে গত ২ দশকের সবচেয়ে বড় কয়েকজন তারকাকে।

২ হাজার দশকের মাঝামাঝি সময়ে যারা বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে। কেউ জিতেছেন বিশ্বকাপ, কেউ জিততে পারেননি। কেউ দেশের হয়ে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, আবার কেউ আজও অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায়। 

লিওনেল মেসি


মেগা টুর্নামেন্টে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা মেসির নাম উচ্চারণ করলেই পুরো একটি যুগ বা তারও অধিক সময় চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ২০০৬ সালে জার্মানিতে বিশ্বকাপ অভিষেকের সময় তিনি ছিলেন এক কিশোর প্রতিভা। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২- প্রতিটি বিশ্বকাপই তাকে আরও প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০১৪ সালে ফাইনালে হারের বেদনা, ২০১৬ সালে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা, আবার ফিরে এসে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়, ২০২৬ এর প্রথম পর্বে গোলসংখ্যা ১৬-তে নিয়ে গিয়ে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসানো- মেসির এই ক্যারিয়ার বেশ রোমাঞ্চকর।

কাতারে ট্রফি জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায় সেখানেই শেষ হবে। কিন্তু তিনি এখনও খেলছেন। আর্জেন্টিনার জার্সিতে এই তারকা খেলোয়াড় মাঠে নামলে এখনও কোটি মানুষ টিভির সামনে বসে পড়েন।


৩৮ বছর বয়সে ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মেসির সাহসী সিদ্ধান্ত। তার খেলার বুদ্ধিমত্তা, পাসিং এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এখনও অটুট। এটাই সম্ভবত তার শেষ বিশ্বকাপ। ফুটবলপ্রেমীরা জানেন, মেসির শেষ মানে শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়, একটি সোনালি যুগের সমাপ্তি। যদিও সম্প্রতি আর্জেন্টিনার এক সাংবাদিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের অবসর প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, 'আমি ফুটবল খেলতে ভালোবাসি এবং যতদিন মনে হবে আমি পারছি, ততদিন খেলা চালিয়ে যাব।'

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো


২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ২০২৬- ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে রেকর্ড গড়েছেন ৪১ বছর বয়সী পর্তুগিজ এই তারকা। গোলের সামনে তার উপস্থিতি সেরা। ফুটবল ক্যারিয়ারের ৩৭টি শিরোপা জয় করেছেন তিনি। ৩৭টি ট্রফির মধ্যে ২৭টিতেই টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন রোনালদো। বাকি ১০টি শিরোপা জয়ের ক্ষেত্রেও তিনি তার দলের শীর্ষ ৩ গোলদাতার মধ্যে ছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফি এখনও তার নাগালের বাইরে। ২০২২ সালে অনেকেই ভেবেছিলেন, রোনালদোর সময় শেষ। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে তিনি আবারও বিশ্বমঞ্চে। রোনালদোর জন্য এই বিশ্বকাপই হয়ত শেষ সুযোগ, যেখানে তিনি ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্রফিটিকে স্পর্শ করার স্বপ্ন দেখছেন।

লুকা মদরিচ


ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আন্ডাররেটেড কিংবদন্তির নাম লুকা মদরিচ। এ পর্যন্ত ৫টি বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি। ক্রোয়েশিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত শৈশব থেকে উঠে এসে তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। তার খেলা নির্ভর করেছে বুদ্ধিমত্তা, কৌশল এবং অসাধারণ পাসিংয়ের উপর। ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়াকে ফাইনালে তুলে তিনি বিশ্বকে বিস্মিত করেছিলেন। সেই আসরে গোল্ডেন বলও জিতেছিলেন।

চল্লিশ বছর বয়সে এসেও ক্রোয়েশিয়ার ১৯৬ ক্যাপের রেকর্ডধারী এই তারকা জাতীয় দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। যদিও তার ক্যারিয়ারের সূর্যাস্ত ঘনিয়ে এসেছে, তবুও মাঠে নামলে এখনও তিনি খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ সম্ভবত তার শেষ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। 

নেইমার


ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে পেলে, গ্যারিঞ্চা, জিকো, রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহোদের পাশে নেইমারের নাম হয়ত কখনও পুরোপুরি বসানো যাবে না। কারণ, প্রত্যাশা ছিল আরও বড়। তবুও পরিসংখ্যান বলছে, এই তারকা ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৭৯)। তাই তাকে ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলার বলা যেতেই পারে।


ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় তাকে লড়াই করতে হয়েছে ইনজুরির সঙ্গে। বিশেষ করে বিশ্বকাপগুলোতে ভাগ্য কখনও তার পাশে দাঁড়ায়নি। ২০১৪ সালে কোমরে চোট পেয়ে ভয়াবহ ইনজুরি, ২০১৮ সালে ডান পায়ের মেটাটারসাল ভেঙে যাওয়ায় অসম্পূর্ণ ফিটনেস, ২০২২ সালে গোড়ালিতে চোট, সর্বশেষ ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ডান পায়ের কাফে ইনজুরি! তার বয়স এখন ৩৪। ব্রাজিলে ইতোমধ্যে নতুন প্রজন্ম উঠে এসেছে। ফলে এটিই সম্ভবত তার শেষ বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ ট্রফি ছাড়া বিদায় নিলে তার ক্যারিয়ারে একটি বড় অপূর্ণতা থেকেই যাবে।

রবার্ট লেভানডভস্কি


ইউরোপীয় ফুটবলের গত এক দশকের সবচেয়ে ধারাবাহিক স্ট্রাইকারদের একজন ৩৭ বছর বয়সী রবার্ট লেভানডভস্কি। স্পেনে চার বছরে ৩টি লা লিগা জিতেছেন তিনি। তিনটি সুপার কাপ ও ১টি কোপা দেল রে শিরোপা তো রয়েছেই। ২০২২ সালে সাড়ে চার কোটি ইউরোতে বায়ার্ন মিউনিখ থেকে বার্সায় যোগ দেন লেভান্ডভস্কি। পোল্যান্ডের এই আন্তর্জাতিক তারকা ১৯১ ম্যাচে করেছেন ১১৯ গোল। এ ছাড়া পেয়েছেন অসংখ্য ব্যক্তিগত পুরস্কার। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে খুব বেশি সাফল্য পাননি। কারণ, পোল্যান্ড কখনও শক্তিশালী দল ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, এটাই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। কেননা তিনি যে বয়সে খেলছেন এখনও, স্ট্রাইকারদের জন্য এটিই অনেক বেশি।

ম্যানুয়েল নয়্যার


আধুনিক গোলকিপিংয়ের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন জার্মানির ম্যানুয়েল নয়্যার। তিনি শুধু গোল বাঁচাননি, ডিফেন্সের পেছনে দাঁড়িয়ে অতিরিক্ত ডিফেন্ডারের কাজও করেছেন। ২০০৯ সালে জার্মানির হয়ে অভিষেক হয় তার। এরপর ১২৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন অভিজ্ঞ এই কিপার। ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬- পাঁচটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার বিরল নজিরও গড়েছেন। এমনকি ২০১২, ২০১৬, ২০২০ ও ২০২৪ সালের ইউরোতেও অংশগ্রহণ করেছেন।

২০১৪ সালে জার্মানির বিশ্বকাপ জয়ে তার অবদান ছিল অপরিসীম। জিতেছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের পুরস্কার ‘গোল্ডেন গ্লাভস’। এখন বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। ইনজুরিও বেড়েছে। তবুও অভিজ্ঞতার কারণে তিনি এখনও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ বিশ্বকাপ সম্ভবত তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়।

সন হিউং-মিন


এশিয়ান ফুটবলের মুখ বলতে ৩৩ বছর বয়সী সন হিউং-মিনের নাম সবার আগে আসে। দক্ষিণ কোরিয়াকে তিনি বহুবার একা হাতে টেনে নিয়ে গেছেন বড় মঞ্চে। ২০০২ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল যাত্রার সদস্য ছিলেন তিনি। ২০১৮ বিশ্বকাপে জার্মানিকে হারানোর ঐতিহাসিক ম্যাচে তার গোল এখনও কোরিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বড় স্মৃতিগুলোর একটি। ২০২৬ তার শেষ বিশ্বকাপ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

কেভিন ডি ব্রুইনা


বেলজিয়ামের তথাকথিত ‘গোল্ডেন জেনারেশন’ বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, কিন্তু কেভিন ডি ব্রুইনা ছিলেন সেই প্রজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ। ৩৫ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডারদের একজন। তার পাসিং, ভিশন এবং সৃজনশীলতা আধুনিক ফুটবলে এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। তবে, ২০৩০ বিশ্বকাপে তাকে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

থমাস মুলার


থমাস মুলার- যিনি ২০২১০ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে পাঁচ গোল করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেবারে ৬টি খেলায় সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসাবে গোল্ডেন বুট পেয়েছিলেন জার্মানির এই খেলোয়াড়। ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ মিলিয়ে অসংখ্য গোল ও অ্যাসিস্ট করেছেন স্ট্রাইকার থমাস। ২০২৬ সালে তাকে শেষবারের মতো জার্মান জার্সিতে দেখা যেতে পারে।

২০২৬ হয়ত সেই বিশ্বকাপ, যেখানে ফুটবলপ্রেমীরা শেষবারের মতো একই মঞ্চে দেখতে পারে মেসি, রোনালদো, মদরিচ, নেইমার, লেভানডভস্কি, নয়্যার, ডি ব্রুইনা কিংবা সন হিউং-মিনকে। বিশ্বকাপ আসে চার বছর পর পর, কিন্তু মেসি-রোনালদোদের মতো প্রজন্ম বারবার আসে না। ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই ফুটবলের এক স্বর্ণযুগকে বিদায় জানানোর মহামঞ্চ!

সময়ের আলো/মহু



  বিষয়:   ২০২৬ বিশ্বকাপ  ফুটবল  খেলোয়াড়  লিওনেল মেসি  কেভিন ডি ব্রুইনা  থমাস মুলার  সন হিউং-মিন  ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো  লুকা মদরিচ  নেইমার  রবার্ট লেভানডভস্কি  ম্যানুয়েল নয়্যার 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: