অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থায় একাধিক পরিবর্তন আসছে। দেশটির সরকার অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর এবং নিয়মতান্ত্রিক করতে বিভিন্ন নীতিমালায় সংশোধন ও পরিমার্জন করছে। ফলে যারা বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন, নতুন করে ভিসার আবেদন করার পরিকল্পনা করছেন কিংবা কর্মী স্পনসরশিপের সঙ্গে যুক্ত, তাদের জন্য নতুন নিয়মগুলো জানা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য হলো আবেদন প্রক্রিয়ার জট কমানো, নিয়মের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনশক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
শিক্ষার্থী ভিসা আপিলে আসছে বড় পরিবর্তন : অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন বাতিল হলে এতদিন আপিল প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে শুনানির জন্য আবেদনকারীদের সরাসরি উপস্থিতও হতে হতো।
নতুন ব্যবস্থায় প্রশাসনিক পুনর্বিবেচনা ট্রাইব্যুনাল (এআরটি) জমা দেওয়া নথি ও প্রমাণপত্র পর্যালোচনা করে অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ফলে আবেদনকারীদের সরাসরি শুনানিতে অংশগ্রহণের প্রয়োজন কমে আসবে এবং নিষ্পত্তির সময়ও কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
অতীতে কিছু আবেদন নিষ্পত্তি হতে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগত। নতুন ব্যবস্থার ফলে সেই দীর্ঘসূত্রতা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরু থেকেই আবেদনপত্র ও সহায়ক কাগজপত্র নিখুঁতভাবে প্রস্তুত করা এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
৪০৭ প্রশিক্ষণ ভিসায় বাড়তি নজরদারি : অস্ট্রেলিয়ার ৪০৭ প্রশিক্ষণ ভিসাধারীদের কার্যক্রমের ওপরও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এই ভিসার মাধ্যমে যারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন এবং যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের স্পনসর করছে, তাদের কার্যক্রম এখন আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
অভিবাসন বিভাগের কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি কর্মস্থলে গিয়ে যাচাই করছেন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না এবং ভিসার শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধ এবং প্রকৃত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিশ্চিত করতেই সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে স্পনসর প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে আরও সতর্ক থাকতে হবে।
রিজিওনাল স্পনসরশিপে বাড়ছে ন্যূনতম বেতনসীমা : অস্ট্রেলিয়ার আঞ্চলিক বা রিজিওনাল এলাকায় দক্ষ কর্মী নিয়োগের জন্য ব্যবহৃত সাবক্লাস ৪৮২ ও ৪৯৪ ভিসার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসছে।
আগামী জুলাই থেকে এসব কর্মীর জন্য ন্যূনতম বার্ষিক বেতনসীমা প্রায় ৮০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলারে উন্নীত করা হবে। এর ফলে বিদেশি কর্মী নিয়োগে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
বিশেষ করে ছোট ব্যবসা, স্থানীয় রেস্তোরাঁ এবং আঞ্চলিক এলাকার নিয়োগদাতাদের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ এসব অঞ্চলে সাধারণত বেতন কাঠামো বড় শহরের তুলনায় কিছুটা কম হয়ে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বেতনসীমা দক্ষ কর্মীদের জন্য ইতিবাচক হলেও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ ব্যয় বাড়াবে।
স্কিল অ্যাসেসমেন্টে ভাষা সহজ, তবে সময় লাগছে বেশি : দক্ষ পেশাজীবীদের যোগ্যতা মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকা ট্রেড রিকগনিশন অস্ট্রেলিয়া (টিআরএ) তাদের স্কিল অ্যাসেসমেন্ট নির্দেশিকাগুলোর ভাষা আরও সহজ করেছে।
এর ফলে আবেদনকারীদের জন্য নিয়মগুলো বোঝা সহজ হবে। তবে মূল যোগ্যতা বা মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়নি। অন্যদিকে আবেদনকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে স্কিল অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন হতে প্রায় চার মাস পর্যন্ত সময় লাগছে বলে জানা গেছে।
পারিবারিক ও প্যারেন্ট ভিসার কোটা ঘোষণা : আগামী অর্থবছরের জন্য পারিবারিক পুনর্মিলনভিত্তিক ভিসা কর্মসূচিতেও আসনসংখ্যা নির্ধারণ করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার।
এর মধ্যে কন্ট্রিবিউটিং প্যারেন্ট ভিসার জন্য ৬ হাজার ৮০০টি আসন বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তাদের বাবা-মাকে দেশটিতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।
অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও নিয়মতান্ত্রিক করার উদ্যোগ : সামগ্রিকভাবে নতুন পরিবর্তনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়া সরকার অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ এবং দক্ষ আবেদনকারীদের জন্য উপযোগী করে তুলতে চাইছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মের এই পরিবর্তন শুরুতে কিছুটা জটিল মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি আবেদনকারীদের জন্য একটি আরও সুশৃঙ্খল ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। তাই নতুন নিয়ম নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা এবং নিয়ম মেনে আবেদন করাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে।
সময়ের আলো/আআ