আদম ব্যবসার ফাঁদে পিষ্ট প্রবাস জীবন

সাব্বির আহমেদ

প্রবাস

সংসারে অভাবের তাড়নায় ২৫ বছর বয়সকালে জুয়েল গাজী আসেন মালয়েশিয়ায়। এসে যেই কাজ করার কথা, সেটি পাননি। বাধ্য হন অপ্রাতিষ্ঠানিক

2026-06-23T02:59:29+00:00
2026-06-23T02:59:29+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রবাস
আদম ব্যবসার ফাঁদে পিষ্ট প্রবাস জীবন
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ২:৫৯ এএম 
সংগৃহীত ছবি
সংসারে অভাবের তাড়নায় ২৫ বছর বয়সকালে জুয়েল গাজী আসেন মালয়েশিয়ায়। এসে যেই কাজ করার কথা, সেটি পাননি। বাধ্য হন অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে। এতে প্রতি বছরই ভিসা নবায়ন করতে হচ্ছে তাকে। এটি করতে খরচ হয় লাখ দেড়েক টাকা। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলছে তার এমন দিনলিপি। প্রথম কাজ করেন মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়া এলাকায়। এখন জহুর বারুতে। দালালের মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকা খরচায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় এসেও অধরাই থাকল শ্রমিক জুয়েল গাজীর দুদণ্ড সুখ।

সোমবার দুপুরে মালয়েশিয়ায় তার সঙ্গে সরাসরি কথা হয় এই প্রতিবেদকের। জুয়েল জানান, আসার পর তিনি আর বাংলাদেশে যাননি। গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। একেক সময় একেক কাজ করে ধারদেনা পরিশোধের চেষ্টা করছেন। আরও কয়েক বছর এখানে থেকে গুছিয়ে যেতে চান দেশে।

জুয়েলের চেয়ে ভয়াবহ অবস্থা তার সমবয়সি রুকন উদ্দিনের। তার বাড়িও একই জেলায়। তিনি যে মালিকের অধীনে মালয়েশিয়ায় এসেছেন, সেই মালিকের অবস্থা ভালো নয়। ছোট্ট কোম্পানি, কর্মীদের বেতন দিতে পারছে না। বাধ্য হয়ে চুক্তিভিত্তিক বাংলাদেশি একটি রেস্টুরেন্টে পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন। এতেও আছে পুলিশি হয়রানির ভয়। 

থাইল্যান্ড সীমান্তঘেঁষা ক্লান্তা এলাকায় থাকতেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের নাছির মীর। পরে মালয়েশিয়ায় কারাগারের বন্দি। তার খালাতো ভাই জবির মিয়াও একই এলাকায় থাকেন। নাছির জানান, দালালের মাধ্যমে থাইল্যান্ড হয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় আসেন। এসেই পুলিশের হাতে আটক হন। এরপর তিন মাসের সাজা দেওয়া হয়। জবির মিয়া সাজা শেষে দেশে ফেরার চেষ্টা করছেন। 

মালয়েশিয়ায় বেসরকারি চাকুরে চুয়াডাঙ্গার আমিনুল ইসলাম রতন। ১৯৯৩ সাল থেকে দেশটিতে আছেন। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ক্যাম্পের ভেতরে অনেকেই মারা যান। সোমবার তার সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয় মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়ায়। 

ঘণ্টাখানেক আলাপে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় সাধারণ প্রবাসীরা শোষিত হচ্ছেন, বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠিত প্রবাসীদের দ্বারা। তারা মূলত আদম ব্যবসায়ী। আদম ব্যবসা করেই অনেকে হচ্ছে কোটিপতি। কিন্তু হাজারো শ্রমিকের জীবন তছনছ হয়ে যায় তাদের কারণে। মুদি দোকানি, পান দোকানিসহ বিভিন্ন ছোট কোম্পানি ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়ে এসে কাজ দিতে পারে না। পরে বাধ্য হয়ে এক জায়গার কর্মী আরেক জায়গায় কাজ করছেন। পুলিশের হাতে ধরাও পড়ছেন। যাদের আত্মীয়স্বজন নেই তারা দীর্ঘদিন কারাগারেই থাকছেন। কেউ কেউ মারাও যাচ্ছেন। 

আমিনুলের মতে, দালালদের সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তাও অবৈধ কাজে জড়িত। তাদের নিয়ে শুরু থেকেই সাধারণ প্রবাসীদের বিরূপ ধারণা রয়েছে। মূলত হাইকমিশনের শ্রম ও পাসপোর্ট উইংয়ে সমস্যা বেশি। যেমন ই-পাসপোর্ট করার মালয়েশিয়ার বেসরকারি এজেন্ট ‘ইএসকেএল’। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এটির অনুমোদন দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার বন্ধ করতে চাইলেও আইনি বাধ্যবাধকতা দেখিয়ে ইএসকেএল কোর্ট থেকে এ বিষয়ে স্টে অর্ডার নিয়েছে।

এখন বিএনপি নেতা ও বাফুফের সভাপতি তাবিথ আউয়াল এটি দেখভাল করছেন। আমরা চাই এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাক।

বায়োমেট্রিক, আই-স্ক্রিনিং সবই আমরা দিয়ে আসি। পরে পাসপোর্টগুলো দূতাবাসে পাঠায়। এরপর পাসপোর্ট অ্যাকটিভ করতে ইএসকেএলের অফিসে যেতে হয়। অথচ পাসপোর্ট অ্যাকটিভ করার কথা সরকারের। আমরা চাই এই হয়রানি বন্ধ হোক। ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হোক।

সাত বছর ধরে মালয়েশিয়ায় শাহজাহান মিয়া : শাহজাহান মিয়া। দুই ছেলের বাবা তিনি। এক ছেলে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক। বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুর। এক যুগ ধরে আছেন এ দেশে। কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে তার সঙ্গে কথা। তিনি জানান, তার অনেক পরিচিত স্বজনকে পালিয়ে থাকতে হচ্ছে। পুলিশের ভয়ে থাকেন তারা। ভিসা পারমিট নেই। অনেকে সাগর পাড়ি দিয়ে আসছেন। মালিক ভালো না হলে অবৈধভাবে কাজ করেন অনেকে।

৩৩ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জের হোসেন আলী থাকেন মালয়েশিয়ায় কুয়ালালামপুরে। নামিদামি রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, বাংলাদেশের দালাল চক্রগুলো গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করে এবং ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। জাল ভিসা, ফেক ওয়ার্ক পারমিট বা ট্রাভেল ভিসা দিয়ে কর্মসংস্থান ভিসার নামে প্রতারণা করে। 

শ্রমিকরা লোভে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। আর আদম ব্যবসায়ীরা সরলতা কাজে লাগিয়ে ঝুঁকিতে ঠেলে দেয় তাদের। অনেকে ট্যুরিস্ট ভিসায় এনে কাজের ভিসা দেওয়ার ভুয়া আশ্বাস দেয়। এই ফাঁদে পড়ে শ্রমিকদের জমিজমা বিক্রি থেকে শুরু করে পুরো পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে।

এদিকে মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন কারণে কারাগারে থাকা প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশিকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার মালয়েশিয়া সফরে এসে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে নানা কারণে কারাগারে আছেন। এসব প্রবাসীর মুক্তির বিষয়ে সরকার সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টায় থাকবে। তাদের সমস্যার সমাধান এবং দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করার বিষয়েও আমরা চেষ্টা করব।

আর দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার বিষয়ে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশি প্রবাসী এবং যারা বিভিন্ন জেলে আটক আছেন, তাদের বিষয়টি মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করে কীভাবে দ্রুত মুক্ত করা যায় সেই বিষয় আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

সময়ের আলো / আরবিএন 

  বিষয়:   আদম ব্যবসা  প্রবাস জীবন 


Advertisement
Loading...
Loading...
প্রবাস- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: