চীনের তিব্বত অঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ভারতের সীমান্ত থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে এই মেগা প্রকল্প ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইট চিত্র ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে—সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত অতিক্রমকারী নদীগুলোর ওপর চীনের বড় অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে ভারত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এই বাঁধটি নির্মিত হচ্ছে ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর, যা তিব্বতে উৎপন্ন হয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করলে সিয়াং নামে পরিচিত হয়। এরপর আসামে এটি ব্রহ্মপুত্র নদে রূপ নেয় এবং বাংলাদেশে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়। ফলে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন, কৃষি ও অর্থনীতি।
ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটির অগ্রগতি তারা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের মতে, এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নয়, বরং আঞ্চলিক জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এত বড় বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে পরিবর্তন আসতে পারে। পলি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়া, কৃষি জমির উর্বরতা কমে যাওয়া, বন্যার ধরন পরিবর্তন এবং নদীর জীববৈচিত্র্যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকিও রয়েছে।
এছাড়া কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেও এই প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ভারত। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উজানে বিশাল জলাধার তৈরি হলে চীন ভবিষ্যতে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, যা আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে চীন দাবি করেছে, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও বিদ্যুৎ সক্ষমতা বৃদ্ধি। বেইজিংয়ের মতে, এতে নিম্নপ্রবাহের দেশগুলোর পানিপ্রবাহ বা স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
তবে ভারত এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চীনের সব ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে গঠিত ভারত-চীন বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের যৌথ ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্ত অতিক্রমকারী নদীগুলো নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হয়ে থাকে। তবে নতুন এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ আবারও দক্ষিণ এশিয়ার জলনিরাপত্তা ও কূটনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রহ্মপুত্র নদ শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই প্রকল্পের পরিবেশগত ও পানিপ্রবাহগত প্রভাব পুরো অঞ্চলের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ