১৯৯৬ সালের ১০ মে। হিমালয়ের ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার উচ্চতার এভারেস্ট চূড়ায় উঠে ইতিহাস গড়েছিলেন ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) ল্যান্স নায়েক দর্জে মোরুপ। ভারত-চীন সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত এই সাহসী পর্বতারোহী ছিলেন তিব্বতের দুর্গম উত্তর ঢাল দিয়ে এভারেস্ট জয়ের লক্ষ্যে যাত্রা করা ছয় সদস্যের ভারতীয় দলের অন্যতম সদস্য।
তবে এভারেস্ট জয়ের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। চূড়া থেকে নামার পথেই ভয়াবহ তুষারঝড়ে প্রাণ হারান মোরুপ ও তার দুই সহযোদ্ধা তসেওয়াং স্মানলা এবং তসেওয়াং পালজোর। প্রায় ৮ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতায় মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বরফের নিচে চিরতরে হারিয়ে যান মোরুপ।
উজ্জ্বল সবুজ রঙের জুতা পরা অবস্থায় তার মরদেহটি পড়ে থাকায় পরবর্তীতে পর্বতারোহীদের কাছে সেটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘গ্রিন বুটস’ নামে। দীর্ঘদিন ধারণা করা হতো, এ মরদেহটি তসেওয়াং পালজোরের। তবে পোশাক, সঙ্গে থাকা সরঞ্জাম এবং রেডিও যোগাযোগের অবস্থান বিশ্লেষণ করে আইটিবিপি নিশ্চিত হয়েছে, এভারেস্টের অন্যতম পরিচিত ‘গ্রিন বুটস’ আসলে দর্জে মোরুপেরই মরদেহ।
প্রায় তিন দশক পর সেই মরদেহ নিজ ভূমি লাদাখে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা করছে আইটিবিপি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে মোরুপের মরদেহ এভারেস্টের উত্তর ঢাল থেকে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। এরপর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তবে এই উদ্ধার অভিযান মোটেও সহজ নয়। হিমালয়ের ৮ হাজার মিটারের ওপরের অঞ্চলকে বলা হয় ‘ডেথ জোন’। সেখানে বাতাসের চাপ ও অক্সিজেনের পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে। তিব্বতের খাড়া ও পাথুরে উত্তর ঢাল আরও বিপজ্জনক। নেপালের দিকের মতো সেখানে সহজে হেলিকপ্টার সহায়তাও পাওয়া যায় না।
বরফে দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে মরদেহের ওজনও কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। এমন দুর্গম এলাকায় নিরাপদে দড়ি স্থাপন ও উদ্ধারকাজ চালাতে প্রয়োজন হতে পারে ১০ থেকে ১২ জন দক্ষ শেরপার। তবে একটি মরদেহ উদ্ধারের জন্য কোনো জীবিত উদ্ধারকর্মীর জীবন যেন ঝুঁকিতে না পড়ে, সেটিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে আইটিবিপি। এ জন্য নিজস্ব অর্থায়নে বিশেষজ্ঞ পর্বত উদ্ধারকারী দল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে মোরুপের পরিবারও তিন দশক ধরে অপেক্ষা করছে প্রিয় মানুষটির শেষ বিদায়ের জন্য। তার ৭৫ বছর বয়সী স্ত্রী কনচাক ইয়াংস্কিট আজও স্বামীর মৃত্যুকে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি। কারণ, তিনি কখনো স্বামীর মরদেহ দেখেননি, হয়নি শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতাও। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তার মনে হয়, হয়তো কোনো একদিন মোরুপ দরজায় কড়া নাড়বেন।
লাদাখের বাড়িতে এখন মোরুপের স্মৃতি বলতে রয়েছে কয়েকটি পুরোনো ছবি, কিছু পদক এবং চীন সরকারের দেওয়া এভারেস্ট জয়ের ঐতিহাসিক সনদ। ছেলে পাঞ্চোক দর্জাই জানান, বাবার মরদেহ ফিরে এলে লেহের মার্টিয়ার্স পার্কের কাছে দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া একজন শহীদের পূর্ণ মর্যাদায় তার শেষকৃত্য করা হবে।
তিন দশকের বেদনাময় অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার বাবাকে শেষ বিদায় দিতে চান মোরুপের স্বজনরা। একই সঙ্গে ‘গ্রিন বুটস’ হিসেবে পরিচিত তার ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নটি এভারেস্ট জয়ের সনদের পাশে সযত্নে সংরক্ষণ করতে চায় পরিবার। তাদের কাছে এটি শুধু একটি জুতা নয়, বরং দর্জে মোরুপের সাহস, আত্মত্যাগ ও অসমাপ্ত এভারেস্ট অভিযানের প্রতীক।
সময়ের আলো/কেএইচও