যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তেহরানের অর্জিত কূটনৈতিক সাফল্য বলে দাবি করেছে তেহরান। ইরানি পক্ষ থেকে আরও বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে তেহরানে নিজ সামরিক লক্ষ্যগুলোর একটিও পূরণ করতে পারেনি ওয়াশিংটন।
পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের বরাতে জানা গেছে, ১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারকটি বৃহস্পতিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাক্ষর করেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর হয়। খবর আরটি ডটকম, ইরনা নিউজ ও প্রেস টিভির।
ইরনার খবরে বলা হয়, এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করবেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বৃহস্পতিবার সকালে টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এই খবর জানিয়ে বলেন, সমঝোতা স্মারকের খসড়াটি ফারসি এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই স্বাক্ষরিত হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডে মুখোমুখি বৈঠকের পরিবর্তে ভার্চুয়ালি চুক্তি স্বাক্ষরের কথা উল্লেখ করে বাঘাই আরও বলেন, গত ২৪ ঘণ্টা আলোচনার পর আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের সশরীরে উপস্থিত না হয়েই সমঝোতা স্মারকের খসড়াটিতে স্বাক্ষর করাই শ্রেয়। বাঘাইয়ের মতে, এই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ হলো, দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা সরাসরি স্বাক্ষর করলে চুক্তি লঙ্ঘনের রাজনৈতিক ঝুঁকি বেড়ে যেত।
সুইজারল্যান্ডে পরবর্তী বৈঠকের কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি জানান, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর আলোচনার পরবর্তী পর্যায় শুরু হবে এবং সুইস বৈঠক আয়োজনের বিষয়টি এখনও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। তবে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে।
রুশ গণমাধ্যম আরটি লিখেছে, এই চুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অনেক সংযত ও সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দিতে দেখা গেছে। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে সইয়ের আগ পর্যন্ত হোয়াইট হাউস সমঝোতার চূড়ান্ত পাঠ্য প্রকাশ করতে নারাজ। তবে গোপনীয়তার আড়ালে চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ায় বেশ কয়েকদিন ধরে সমালোচনার মুখে পড়ার পর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিনিয়র এক মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সামনে ১৪ দফার একটি নথি পাঠ করে শোনান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বরাতে দৈনিক সময়ের আলোতে গত বুধবার ‘ইরান-মার্কিন চুক্তির বিস্তারিত তথ্য ফাঁস’ শিরোনামে ১৪ দফার বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে।
ইরনা নিউজ লিখেছে, ইরানের সংসদের স্পিকার ও আলোচনায় প্রধান আলোচক মোহাম্মদ গালিবাফ এই সমঝোতাকে যুক্তরাষ্ট্রের আত্মসমর্পণের প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বুধবার এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই চুক্তি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার রেকর্ড। মানুষ যখন এটি পড়বে তখন নিজেরাই বিচার করতে পারবে।
তেহরানের দাবি, এই দলিলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে একাধিক ছাড় দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ও ইরানের তেল রফতানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত ইরানি অর্থ ছাড় এবং ইরানে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন পরিকল্পনা গ্রহণ। এ ছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা চলাকালীন ওয়াশিংটন নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না বা এ অঞ্চলে অতিরিক্ত সামরিক বাহিনী মোতায়েন করবে না বলেও সম্মত হয়েছে।
এর বিনিময়ে ইরান জানিয়েছে, ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনর্বহাল করা হবে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার আগে এই প্রণালি নিয়ে কোনো সমস্যাই ছিল না। এখন তেহরান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি আর যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরবে না।
গালিবাফ বলেন, আমি আবারও স্পষ্ট করে বলছি যে হরমুজ প্রণালি কখনোই আগের অবস্থায় ফিরবে না। প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার বিদ্যমান এবং অবশ্যই এখানে আমরা পরিচালনা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাজের বিনিময়ে ফি বা শুল্ক নেব। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাঘাই বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে এবং সমঝোতা স্মারকে উল্লিখিত নির্দেশনা অনুযায়ী ইতিমধ্যেই ওমানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চালানো হয়েছে।
এ ছাড়া সমঝোতা স্মারকে লেবানন প্রসঙ্গে যে বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে, তা তেহরানের পক্ষ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। বাঘাই বলেন, যদি ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠী লেবাননের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তা এই সমঝোতা স্মারকের অধীনে অপর পক্ষের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
এই সমঝোতা স্মারকটি কোনো চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি নয়; বরং এর মাধ্যমে ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা শুরু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে উভয়পক্ষ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, স্থগিত রাখা আর্থিক সম্পদ, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিচালনা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন সাপেক্ষে একটি চূড়ান্ত সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করবে।
সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক বিষয়ক অংশে বলা হয়েছে, তেহরান ‘পুনরায় নিশ্চিত করছে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না।’ তেহরান দীর্ঘদিন ধরে একই বক্তব্য প্রদান করে আসছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পূর্ববর্তী দুটি হামলার সময়ও এই একই অবস্থান ব্যক্ত করেছে।
সমঝোতা স্মারকে আরও যোগ করা হয়েছে যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ পরিচালনার জন্য উভয় পক্ষ একটি পদ্ধতি তৈরি করবেন; প্রাথমিকভাবে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে স্থানীয়ভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধির মাত্রা কমিয়ে আনা হবে।
ইলেকট্রনিক্যালি নথিটি স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সামাজিকমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বিভিন্ন বিষয়ে পোস্ট দিলেও চুক্তি সম্পর্কিত কোনো পোস্ট করেননি। তবে স্বাক্ষরের আগে একই দিনে তিনি সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, চুক্তির শর্ত পালনে ইরান ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও