হ্যারি কেইন এখন ইংল্যান্ড ফুটবলের এমন এক নাম, যাকে ঘিরে বিশ্বকাপ মঞ্চে তৈরি হচ্ছে নতুন ইতিহাসের অধ্যায়। চাপের মুহূর্তে দায়িত্ব নেওয়া, বড় ম্যাচে গোল করা এবং ধারাবাহিকভাবে দলকে ভরসা দেওয়া- সব মিলিয়ে তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার হিসেবে নিজের অবস্থান পোক্ত করেছেন।
কেইনের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয় ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ দিয়ে। রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত সেই আসরে তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক এবং সবচেয়ে বড় তারকা। টুর্নামেন্টে ৬ গোল করে তিনি জেতেন গোল্ডেন বুট, যা তাকে বিশ্বফুটবলের এলিট স্ট্রাইকারদের কাতারে নিয়ে যায়। পেনাল্টি, হেড এবং বক্সের ভেতরের নিখুঁত ফিনিশিং- সব মিলিয়ে সেই আসরেই তিনি প্রমাণ করেন বড় মঞ্চে কতটা কার্যকর এবং মানসিকভাবে কতটা শক্তিশালী একজন ফরোয়ার্ড।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড আবারও তাকিয়ে ছিল তার নেতৃত্ব ও গোলের দিকে। শুরুটা ভালো হলেও শেষটা ছিল হৃদয়ভাঙা। ফ্রান্সের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে গুরুত্বপূর্ণ এক পেনাল্টি মিস করেন তিনি, যা ইংল্যান্ডের বিদায়ের অন্যতম মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায়। তবে ওই আসরেই তিনি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন এবং কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকারের রেকর্ডের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যান। চাপের মধ্যেও দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা তাকে আলাদা করে তোলে, যদিও ফলাফল সবসময় তার পক্ষে ছিল না।
২০২৬ সালে এসে গল্পটা আবার নতুনভাবে শুরু হয়। শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ৪-২ গোলের জয়ে জোড়া গোল করে আবারও প্রমাণ করেন কেন তিনি ইংল্যান্ডের মূল ভরসা। ম্যাচের শুরুতেই ১২তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করার সুযোগ পেলেও প্রথম শটে ব্যর্থ হন। তবে ভিএআর সিদ্ধান্ত এবং গোলকিপার ডমিনিক লিভাকোভিচের লাইন ছাড়ার কারণে পুনরায় শট নেওয়ার সুযোগ পেয়ে দ্বিতীয়বার আর ভুল করেননি কেইন। শক্তিশালী শটে বল জালে পাঠিয়ে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন এই অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার।
ম্যাচে জোড়া গোলের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে উঠে আসেন। আর প্রথমার্ধের শেষ দিকে আবারও গোল করে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে গ্যারি লিনেকারের সমান ১০ গোলের রেকর্ডে পৌঁছে যান। লিনেকারের সমান ১২ ম্যাচে এই অর্জন তার ধারাবাহিকতা, শৃঙ্খলা এবং বড় ম্যাচে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার প্রমাণ। ম্যাচে
বাঁ-পায়ে হালকা ব্যান্ডেজ থাকলেও তার পারফরম্যান্সে কোনো প্রভাব পড়েনি, যা সমর্থকদের মধ্যে স্বস্তি এনে দেয় এবং তার ফিটনেস ও মানসিক দৃঢ়তার আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকে।
ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ড কিংবদন্তি লুকা মদ্রিচের ভুলে পাওয়া পেনাল্টি ইংল্যান্ডের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে দেয়। পাশাপাশি তরুণ তারকা জুড বেলিংহাম এবং ননি মাদুয়েকে মাঝমাঠে গতি, ড্রিবলিং এবং আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিরতির পর বেলিংহাম ও ম্যাচের ৮৫ মিনিটে মার্কাস রাশফোর্ড গোল করেন। পুরো ম্যাচে ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ ছিল সংগঠিত ও ধারালো আর গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন জর্ডান পিকফোর্ড, যিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে ম্যাচে এগিয়ে রাখেন।
এই পারফরম্যান্স শুধু একটি জয় নয় বরং কেইনের দীর্ঘ বিশ্বকাপ যাত্রার ধারাবাহিক উন্নতির প্রতিচ্ছবি। ২০১৮ সালে বিস্ফোরক অভিষেক, ২০২২ সালে চাপ ও সমালোচনার মধ্যেও নেতৃত্ব ধরে রাখা আর ২০২৬ সালে এসে পরিণত এক স্ট্রাইকার হিসেবে রেকর্ডের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা। তিন অধ্যায় মিলিয়ে তার ক্যারিয়ার আরও পরিপূর্ণ হয়েছে এবং আরও পরিণত রূপ পেয়েছে।
ক্লাব ফুটবলেও তার গোল করার ধারাবাহিকতা, বিশেষ করে এক মৌসুমে ৬০-এর বেশি গোলের অসাধারণ পারফরম্যান্স, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। তাই এখন তিনি শুধু একজন স্ট্রাইকার নন বরং ইংল্যান্ড দলের মানসিক শক্তির প্রতীক, যিনি ম্যাচের ভাগ্য একাই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
সব মিলিয়ে হ্যারি কেইন এখন ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। বিশ্বকাপের তিনটি ভিন্ন আসরে নিজের ছাপ রেখে তিনি প্রমাণ করেছেন। বড় খেলোয়াড়রা শুধু গোল করে না, তারা ইতিহাসও তৈরি করে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও