হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার অপেক্ষায় ‘বাংলার জয়যাত্রা’, অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

প্রায় সাড়ে তিন মাস পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে।‘অনুমতি পেলে’

2026-06-19T18:57:42+00:00
2026-06-19T19:03:19+00:00
 
  শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার অপেক্ষায় ‘বাংলার জয়যাত্রা’, অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ৬:৫৭ পিএম  আপডেট: ১৯.০৬.২০২৬ ৭:০৩ পিএম
বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। সংগৃহীত ছবি
প্রায় সাড়ে তিন মাস পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে। 

‘অনুমতি পেলে’ জাহাজটি হরমুজ প্রণালী পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে রওনা হবে বলে এক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বাংলাদেশে শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) এমডি কমডোর মাহমুদুল মালেক। তবে শিপিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমতি পাওয়া, হরমুজ প্রণালী জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ হওয়া এবং সেখানে অপেক্ষমাণ বিপুল সংখ্যক জাহাজের সারি— এই তিন কারণে ‘বাংলার জয়যাত্রা’র হরমুজ পাড়ি দিতে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে। 

যুদ্ধ অবসানে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সৌদি আরবের পতাকাবাহী তিনটি সুপারট্যাংকার হরমুজ প্রণালী পাড়ি দেয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন ‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি কোম্পানির অধীনে ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি দুবাই এর জেবেল আলী বন্দরে ভেড়ার পরদিনই ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হয়।

এরপর থেকে পারস্য উপসাগরেই আটকে আছে ‘বাংলার জয়যাত্রা’, মাঝে একাধিকবার প্রণালী পাড়ি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে চ্যানেলের কাছাকাছি অবস্থান নিলেও তা সফল হয়নি। জাহাজটির ৩১ জন নাবিকের সবাই বাংলাদেশি। এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি সইয়ের পর বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালীর ৮০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে অবস্থান নিয়েছে ‘বাংলার জয়যাত্রা’।

বিএসসি’র এমডি কমডোর মাহমুদুল মালেক শুক্রবার এক গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলার জয়যাত্রা গতকাল হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি এসে অপেক্ষায় আছে। চ্যানেল পার হওয়ার অনুমতি পেলে অতিক্রম করবে। চ্যানেল পার হতে আইআরজিসি (ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী) এবং ইরানি নৌবাহিনীর অনুমোদন লাগবে। জাহাজের নাবিকদের সাথে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। তারা সবাই ভালো আছেন। 

বাংলার জয়যাত্রার ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সবাই সুস্থ আছি। এখন শারজাহ বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান নিয়ে আছি। 

‘বাংলার জয়যাত্রা’ বর্তমানে যেখানে আছে, সেখান থেকে হরমুজ প্রণালীর দূরত্ব ৮০ নটিক্যাল মাইল। এই পথ পাড়ি দিতে জাহাজটির ৬-৭ ঘণ্টার মত লাগতে পারে।

ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে সর্বশেষ যে তথ্য আছে, তা হলো হরমুজ প্রণালীর স্থানীয় নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ এখনো প্রণালী পুরোপুরি খোলেনি। এবং আইআরজিসির অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালী পার হতে পারবে না। 

‘বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার অনুমতি পেতে সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করছেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী। 

তিনি বলেন, এখানে কয়েকটি বিষয় আছে। প্রথমত, চ্যানেল জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ হওয়া। দ্বিতীয়ত, অনুমতি পাওয়া এবং তৃতীয়ত, অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা।

আমাদের জানা মতে, চ্যানেলে তিন লেয়ারের মাইন সেট করা আছে। সেখানকার ইরানি কর্তৃপক্ষই কেবল জানে কোথায় কোথায় কীভাবে মাইন সেট করা হয়েছে। মাইন সুইপিং এক্সপার্টরা আগে কাজ করে চ্যানেল নিরাপদ করতে হবে। 

ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, হরমুজ প্রণালির সরু একটি অংশ হয়ত ওপেন করা হয়েছে। অপ্রশস্ত সেই অংশ দিয়ে ছোট আকারের জাহাজ চলাচল করতে পারবে।

কিন্তু বড় আকারের যেসব জাহাজের পানির নিচে থাকা অংশের গভীরতা (ড্রাফট) ৮০-৯০ ফুট, সেসব জাহাজের টার্নিং সার্কেল অনেক বড় হয়। তারা ওই অপ্রশস্ত অংশ দিয়ে পার হতে পারবে না। 

পারস্য উপসাগরে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যার উপরও পার হওয়ার অনুমতি মেলার বিষয়টি নির্ভর করছে বলে মনে করেন আনাম।

তিনি বলেন, প্রায় ১৮ সপ্তাহ ধরে বহু জাহাজ পারস্য উপসাগরে অপেক্ষমাণ। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে সেখানেই জাহাজগুলো ক্লিনিং করতে হবে এবং জাহাজে জমে থাকা বর্জ্য সেখানে রেখে আসতে হবে। সেজন্যও সময় লাগবে। 

আল জাজিরার তথ্য অনুযাযী, হরমুজ প্রণালী পাড়ি দিতে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা প্রায় ৫৫০টি।

ক্যাপ্টেন আনাম বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি সচল হতে ৩-৪ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সেই সময়ে আবার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকারী পক্ষগুলোর মধ্যে অবস্থান কী হয়, সেটাও দেখার বিষয়।  


হরমুজ প্রণালীর এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন জাহাজের নাবিক ও ক্রুরা। বাংলার জয়যাত্রাসহ হরমুজ প্রণালীতে থাকা সাতটি জাহাজে বাংলাদেশি প্রায় একশ নাবিক আছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে আছেন। তারা মানসিকভাবে কতটা বিপর্যস্ত, তা সহজেই অনুমান করা যায়। আমরা নিয়মিত সব জাহাজের নাবিকদের সাথে যোগাযোগ রাখছি।  

এর আগে, ইরান বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালী খুলে দিলে ১৭ এপ্রিল একবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনা সাকার বন্দর থেকে প্রণালীর দিকে রওনা হয়েছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’। পরদিন প্রণালী পাড়ির ‘অনুমতি না পেয়ে’ আবার মিনা সাকার বন্দরে ফিরে যায় জাহাজটি।  

তার আগে যুদ্ধবিরতি শুরু হলে ৮ এপ্রিল হরমুজ প্রণালী পার হতে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে নোঙর তুলে যাত্রা শুরু করেছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’। কিন্তু অনুমতি না পাওয়ায় সেই যাত্রায় হরমুজ প্রণালী পার হতে পারেনি বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজটি।  

যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এর আগেও একবার জাহাজটি পরবর্তী বাণিজ্যিক গন্তব্যে পৌঁছাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দর থেকে হরমুজ প্রণালীর উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। তখন আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ড সদস্যরা ওই পথে না আগানোর পরামর্শ দিলে জাহাজটি আবার ফিরতে বাধ্য হয়। 

‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি। সেদিন কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের বহির্নোঙরে আসে ‘বাংলার জয়যাত্রা’। পরদিন বন্দরের ১০ নম্বর টার্মিনালে ভেড়ে। 

কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হলে পণ্য খালাস বিলম্বিত হয়। ভেড়ার একদিন পরেই জাহাজ থেকে ২০০ মিটার দূরত্বে একটি তেল রিজার্ভারে মিসাইল হামলার পর আগুন ধরে যায়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জেবেল আলী বন্দরের টার্মিনালে অবস্থানের মধ্যেই বন্দরের একটি স্থাপনায় ড্রোন হামলা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ড্রোন ও মিসাইলের আনাগোনার মধ্যে ‘জয়যাত্রা’র নাবিকরা উদ্বেগ নিয়ে দিন পার করতে থাকেন।

এর কয়েকদিন পর জাহাজ থেকে পণ্য খালাস শুরু হয়। পণ্য খালাস শেষে জাহাজটির পুনরায় কাতারে ফেরার কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেটি বাতিল হয়। এরপর ঠিক হয় ‘বাংলার জয়যাত্রা’র মুম্বাই যাবে। 

কিন্তু সেখানে যেতে হলে জাহাজটিকে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে হত। সেই উদ্দেশ্যে রওনা দিলেও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তা আর সম্ভব হয়নি।

জাহাজটিতে বর্তমানে ৩৭ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন সার রয়েছে। হরমুজ প্রণালী পাড়ি দিতে পারলে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা রয়েছে ‘বাংলার জয়যাত্রার’।  


সময়ের আলো/ইউএমএইচ

  বিষয়:   হরমুজ প্রণালী  বাংলার জয়যাত্রা 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: