আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যে সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা তৈরি হচ্ছে, তার ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে এক চরম বৈপরীত্য বা ‘প্যারাডক্স’। ইরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে ওয়াশিংটন যে সব আর্থিক সুযোগ-সুবিধার ‘টোপ’ দিচ্ছে, তা মূলত শক্তিশালী করবে এমন এক বাহিনীকে— যাকে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে বিবেচনা করে। দুবাই থেকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ছায়াতলে থেকেই নিজেদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বিশাল করেছে ইরানের এলিট ফোর্স ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’। তেল, আবাসন নির্মাণ, শিপিং, টেলিযোগাযোগ থেকে শুরু করে বন্দর ব্যবস্থাপনা— ইরানের অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি লাভজনক খাতেই রয়েছে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য।
এখন যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির অংশ হিসেবে যখন ইরানের অবরুদ্ধ শত শত কোটি ডলারের তহবিল মুক্ত করার এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের জন্য দেশটির অর্থনীতি উন্মুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে, তখন এই আর্থিক জোয়ারের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে যাচ্ছে এই এলিট বাহিনীই।
ইরানের চারটি উচ্চপদস্থ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানির অনুমতি এবং বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে যে বিপুল অর্থ ইরানে আসবে, তার একটি বড় অংশ নিজেদের পকেটে পুরতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত আইআরজিসি। তবে তাদের এই কেন্দ্রীয় ভূমিকাই আবার চুক্তির পথে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ আইআরজিসি ইরানের ব্যবসার সাথে এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, তাদের ওপর ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’-এর তকমা বহাল রেখে ইরানের অর্থনীতিকে নিষেধাজ্ঞা মুক্ত করা মার্কিন প্রশাসনের জন্য বেশ জটিল হবে।
ইরানের প্রয়াত বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির হাত ধরে গঠিত এই বাহিনী বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আমলে ব্যাপক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার মালিক হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় খামেনি নিহত হওয়ার পর, দেশের অভ্যন্তরে নিজেদের ক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে আইআরজিসি। এমনকি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করার পেছনেও মূল ভূমিকা ছিল তাদের। বর্তমানে এই বাহিনীটি আমেরিকার সাথে যুদ্ধবিরোধী চুক্তিকে সমর্থন করছে।
একটি শীর্ষ সূত্র আইআরজিসিকে এই যুদ্ধের ‘আসল বিজয়ী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছে, ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা নিশ্চিত করার পর, এখন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সুবিধা নেওয়ার জন্য তারাই সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কারণ বিগত কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে ইরানের অর্থনীতি সচল রাখার মূল কাজটি তারাই নিয়ন্ত্রণ করেছে।
চলতি সপ্তাহে ঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি অনুযায়ী ইরান সাময়িকভাবে তেল বিক্রির সুযোগ পাবে। আর আগামী দিনে যদি কোনো ব্যাপকভিত্তিক চুক্তি হয়, তবে ইরান প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল পুনর্গঠন তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পাবে। আইআরজিসি তাদের কোনো আর্থিক তথ্য প্রকাশ না করলেও, এই বিপুল অর্থ তাদের তেল ব্যবসা, শিপিং অপারেশন এবং কনস্ট্রাকশন নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করবে। আইআরজিসির ইঞ্জিনিয়ারিং শাখা ‘খাতাম আল-আনবিয়া’ বর্তমানে আবাসন, জ্বালানি, গাড়ি নির্মাণ ও পর্যটন খাতের শত শত কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করছে।
ইরানের বিনিয়োগ আইন অনুযায়ী, যেকোনো বিদেশি কোম্পানিকে ব্যবসা করতে হলে স্থানীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্ব করতে হয়। যেহেতু লাভজনক খাতের বেশিরভাগ কোম্পানির মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ আইআরজিসির হাতে, তাই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য তারাই এখন ‘গেটকিপার’ বা প্রবেশদ্বার।
এর ফলে পশ্চিমা কোম্পানিগুলো সরাসরি আইআরজিসির সাথে চুক্তি না করলেও, পরোক্ষভাবে তাদের সাথে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সাবেক নিষেধাজ্ঞা তদন্তকারী জেরেমি প্যানার বলেন, ইরানের তেল খাতের পেছনের মূল সুতোটি আইআরজিসির হাতে। তাই তাদের সাথে ব্যবসা করার আইনি জটিলতাগুলো কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ২০১৬ সালের মার্কিন ‘জাস্টাস এগেইনস্ট স্পনসরস অব টেররিজম অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, কোনো মার্কিন কোম্পানি যদি আইআরজিসির মতো কোনো অভিযুক্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে পরোক্ষভাবেও সাহায্য করে, তবে সন্ত্রাসী হামলার শিকার ব্যক্তিরা সেই মার্কিন কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন।
সময়ের আলো/কহু